সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
তিনটি জনাদেশ
নন্দন রায়
কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি ফ্যাসিস্ট পার্টি যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে, এবং এটাও প্রমাণিত যে এই বিশেষ পরিস্থিতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না, তখন সামগ্রিক ঐক্যের স্বার্থে প্রতিটি দলকে কিছু ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকা উচিত। কিন্তু আপ অথবা তৃণমূলের মতো দলগুলি এতটাই বিভাজনমূলক, যে গণতান্ত্রিক বিরোধী ঐক্যের চেয়ে তাদের কাছে নিজেদের নেতা অথবা নেত্রীর উচ্চাকাঙ্খাই একমাত্র বিবেচ্য।

গুজরাট
এ মাসের সাত ও আট তারিখে প্রথম দিনে দিল্লি পৌরসভার ও দ্বিতীয় দিনে গুজরাট এবং হিমাচল প্রদেশের বিধানসভার নির্বাচনের ফল প্রকাশিত হয়েছে। কর্পোরেট মিডিয়া গুজরাটে টানা সপ্তমবার বিজেপির নিরবচ্ছিন্ন জয়ের রেকর্ডে নরেন্দ্র মোদীর ভাবমূর্তির অপরাজেয়তার ছবি তুলে ধরতে যখন ব্যস্ত , তখন তাদের মনে করিয়ে দেওয়া দরকার বাকি দুটি নির্বাচনে কিন্তু বিজেপি পরাজিত হয়েছে।
একথা বলা মানে কিন্তু গুজরাটে বিজেপির রেকর্ড সংখ্যক আসনে জয়কে কোনমতেই খাটো করা হচ্ছে না। কিন্তু গুজরাটবাসী মানুষেরা কী মূল্যে এই জয় মোদীকে উপহার দিয়েছেন, সেকথাও ভেবে দেখা দরকার। সমস্ত মানবোন্নয়ন সূচকে দেশের ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলের মধ্যে গুজরাটের স্থান একেবারে নিচের দিকের পাঁচ-ছ’টি অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এবিষয়ে তথ্যপঞ্জী ইতিমধ্যে অনলাইন মার্কসবাদী পথে কয়েকদিন আগেই প্রকাশিত হয়েছে। সুতরাং তার পুণরুক্তি অপ্রয়োজনীয়।
‘না খাউঙ্গা না খানে দুঙ্গা’-র মোদীরাজ্যে ৫৩ শতাংশ মানুষ মনে করেন তাদের রাজ্যে বিজেপির গত পাঁচ বছরের রাজত্বে দুর্নীতি বেড়েছে।এবং তাদের মধ্যে ৪৩ শতাংশ মানুষ তবু বিজেপিকেই ভোট দিয়েছে। নিয়োগ পরীক্ষায় একের পর এক দুর্নীতিতে গুজরাট পশ্চিমবঙ্গকে প্রায় ছুঁয়ে ফেলেছে। এই দুর্নীতির দাপটে ২০১৬ সালের নির্বাচনের ঠিক আগে আমরা যেমন কলকাতার পোস্তায় নির্মীয়মান ফ্লাইওভার ভেঙ্গে পড়তে দেখেছিলাম, তেমনি গুজরাটের মোরবীতে সদ্য মেরামত করা সেতু ভেঙ্গে পড়ে দেড়শো মানুষের সলিল সমাধি ঘটিয়েছে। ভোটদাতাদের ৭০ শতাংশ মনে করে মেরামতিতে সরকারের কোনো না কোনো স্তরে দুর্নীতির কারণেই এতগুলো প্রাণ বিসর্জিত হয়েছে। তবু মোরবীতে বিজেপিই জিতেছে। ২০০২ সালের মুসলিম নিধন যজ্ঞে নারদা-পাটিয়া প্রচারে এসেছিল দাঙ্গাবাজদের থেকে লুকিয়ে পালাতে গিয়ে ধরা পড়ে পাঁচ মাসের অন্তঃসত্বা বিলকিস বানুকে ধর্ষণ, তার তিন বছরের মেয়েকে মাটিতে আছড়ে মেরে ফেলা ও সঙ্গের আরও সাতজনকে কুপিয়ে হত্যা করার দায়ে যাবজ্জীবন দন্ডপ্রাপ্ত ১১ জন আসামীকে অমিত শাহের মন্ত্রকের নির্দেশে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। বেঁচে থাকা বিলকিস বানু তার স্বামী-পরিবার সহ আতঙ্কে আবার ঘর ছাড়া। সেই নারদায় বিজেপিই জিতেছে। নারদায় বিজেপির প্রার্থী ছিল কুকরাণী পায়েল, যার বাবা দাঙ্গায় দন্ডপ্রাপ্ত আর এক জেলখাটা কয়েদী, যে প্যারোলে মুক্তি পেয়ে মেয়ের জন্য প্রচার করে বেড়িয়েছেন, মেয়ে ৭১.৫ শতাংশ ভোট পেয়েছে।
এসব হচ্ছে গত তিনদশক জুড়ে বিজেপি-আরএসএস চক্র একাগ্রতার সঙ্গে যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটিয়েছে, তারই ফল। শুধু তাই নয় কাকতালীয়ভাবে গত তিনদশক জুড়ে এদেশে নয়া উদারবাদী কর্মসূচীও চালু রয়েছে। অর্থাৎ কর্পোরেট-হিন্দুত্ববাদী ষড়যন্ত্রে একদিকে যখন দুর্নীতি নিপাতনে সিদ্ধ হয়েছে, তেমনি অন্যদিকে তেমনি মুসলিমদের প্রতি ঘৃণার চাষ গুজরাটি জনমনের ফ্যাসিকরণ ঘটাচ্ছে— এতটাই যে মূল্যবৃদ্ধি, কর্মহীনতার জন্য যে শাসকদলের উৎখাত ঘটানো উচিত, তাকেই আবার বেশি করে ভোট দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হচ্ছে। নারদা-পাটিয়ার ছোট একটি কারখানায় ওয়েল্ডিং-এর কাজ করা উসমানভাই শেখকে তাই যখন ‘দি টেলিগ্রাফের সাংবাদিক প্রশ্ন করেন, এবার কাকে ভোট দেবেন, উসমানভাই বলে ওঠেন, ‘আমি কেবল মোদীজীকে চাই, আর কিছু না।’ (দ্য টেলিগ্রাফ,২৩.১১.২২।)
মনস্তত্ত্ববিদেরা একে বলেন ‘স্টকহোম সিনড্রোম’, যখন নিপীড়িতরা নিপীড়ণকারীর প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। কিন্তু এ যে কী ভয়ানক এক মানবিক ট্র্যাজেডি ঘটে চলেছে আমাদের দেশে, সেকথা কি ভুলে যাওয়া যায়?
অবশ্য একথা অস্বীকার করা যায় না যে আর্থিক সম্পদের এবং পোক্ত সংগঠনের জোরে গুজরাটে বিজেপির সঙ্গে নির্বাচনী লড়াইয়ে ইদানিং পাল্লা দেওয়া কঠিন। গুজরাট এক অনন্য রাজ্য যার সঙ্গে তুলনীয় কেবল মহারাষ্ট্র। স্বাধীনতার বহু আগে থেকেই এই অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যে বেশ উন্নত। ভারতের দেশীয় পুঁজিবাদের বিকাশ এখানেই শুরু হয়েছিল। তাতে অংশগ্রহণ ছিল হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীদেরই। তাদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল স্বাভাবিক। উপনিবেশিক শাসকদের নানারূপ বাধা-নিষেধের ফলে স্বাধীন বিকাশের বিপরীতে বিদেশী শাসকদের বি-শিল্পায়ন নীতিতে এরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। তাই জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রতি এদের সমর্থন ছিল জোরালো। তাই জাতীয় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয় দলই এই অঞ্চলে বেশ শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। পারস্পারিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ধর্মীয় বিভাজনকে তীব্র করে তুলতে বেশি দেরী হল না।
এর ফলে একদিকে যেমন এই অঞ্চল থেকে বহু জাতীয়তাবাদী নেতার উত্থান ঘটেছে যারা স্বাধীনতা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আবার অন্যদিকে তেমনি উগ্র হিন্দুবাদী রাজনৈতিক নেতারও উদ্ভব ঘটেছে, যারা মুসোলিনির আদর্শে আরএসএস-এর প্রতিষ্ঠা করেছে, যাদের একমাত্র এজেন্ডা হিন্দু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা। একশো বছর হতে চললো, আরএসএস-এর এজেন্ডা অথবা মতাদর্শ কিন্তু পাল্টায়নি। ইদানিং মোহন ভাগবতের মাদ্রাসা পরিভ্রমণ ইত্যাদি দেখে কেউ যেন মনে না করেন যে আরএসএস কিছুটা ‘সহনশীল’ হয়ে উঠছে। মুসলিম বিরোধী মতাদর্শ ত্যাগ করা মানে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতিরও অবসান।
সেই মতাদর্শ জনমত সংগঠিত করতে বিজেপি ধর্মীয় মেরুকরণের ওপর নির্ভর করে, যেটা আমরা সমস্ত রাজ্যে নির্বাচনের আগে দেখেছি। গুজরাটেও সে একই ষ্ট্র্যাটেজি বিজেপি অনুসরণ করেছে। প্রথমে বিলকিস বানুর ধর্ষকদের জেল থেক মুক্তি, তারও আগে গুজরাত দাঙ্গায় মোদীর মদতদাতা ভূমিকার বিরুদ্ধে তিস্তা শেতলবাদের জেহাদের জন্য তাকে ইউএপিএ আইনে গ্রেফতার ও জেলে ঢোকানো, বেছে বেছে দাগী প্রার্থীদের মনোনয়ন ইত্যাদি পদক্ষেপের পরেও দেখা গেল নির্বাচনী পরিমন্ডলে হিন্দুত্ববাদী অসহিষ্ণুতার পরিবেশ তেমন ভাবে জোরদার হচ্ছেনা। তখন অমিত শাহ আর ইঙ্গিত-ইশারার পথে না হেঁটে বহু পরীক্ষিত প্রকাশ্য সাম্প্রদায়িক তাসটি খেললেন। এক জনসভায় তিনি বললেন ‘২০০২ সালে মোদীজী ওদের এমন উচিত শিক্ষা দিয়েছেন যে গুজরাটে পাকাপাকিভাবে শান্তি ফিরে এসেছে’ (আবাপ, ২৬.১১.২০২২)। নির্বাচন কমিশন বিজেপির কোনো নেতার বিরুদ্ধে আদর্শ আচরণবিধি ভঙ্গ করার কোনো অভিযোগই শুনবে না বলে পণ করেছে। ফলে এই প্রকাশ্য প্ররোচনামূলক ভাষণের পরেও তারা নিশ্চুপ বসে রইল। আরও ছোট-বড় বহু নেতার কন্ঠে অনুরূপ প্ররোচনার অনুরণন ধ্বনিত হল।
এর ফলে কংগ্রেস যে পরিকল্পনা করে ঘর ঘর প্রচারে দৈনন্দিন জীবনের যে দুর্দশার কথা তুলে ধরছিল, তার আর উপযোগিতা থাকলো না। উপরন্তু কর্পোরেট মিডিয়া এই নিচু তারের প্রচারকে কংগ্রেসের দুর্বলতা বলে চিহ্নিত করলো। তাছাড়া তাদের সাংগঠনিক দুর্বলতা ও খেয়োখেয়ি তো আছেই। মানুষ যাতে বিজেপি বিরোধী প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বীর সামর্থয়ের ওপর ভরসা করতে পারে, তারও তো প্রদর্শনী দরকার। অথচ বড় নেতাদের প্রচারে দেখাই গেল না। রাহুল গান্ধী দুটি জনসভা করলেন। অনুরোধ সত্বেও প্রিয়ঙ্কা এলেন না, নতুন কংগ্রেস সভাপতি একেবারে সেস মুহূর্তে আসার সময় পেলেন। মোটকথা কংগ্রেসের একেবারে হাল ছেড়ে দেওয়ার দশা।
গুজরাটের নির্বাচনী ফলাফল দেখাচ্ছে যে এবারের নির্বাচন বিজেপি এবং কংগ্রেসের মধ্যে দ্বিমুখী লড়াই হয়নি। বরং ত্রিমুখী হয়েছে, যার তৃতীয় শরিক আম আদমী পার্টি (আপ)। এই দলটি ১৩ শতাংশ ভোট এবং পাচঁটি আসন পেয়েছে। এই পাঁচটি আসনই কংগ্রেসের থেকে তারা ছিনিয়ে নিয়েছে। ২০১৭ সালের তুলনায় কংগ্রেসের ভোট কমেছে ১৪ শতাংশ আর আপ পেয়েছে ১৩ শতাংশ । ফলে পাটিগণিতের হিসেব অনুসারে কংগ্রেসের ভোটে আপই থাবা বসিয়েছে। ভোটের ফল বলছে এই অনুমান পুরোপুরি ঠিক না হলেও অনেকাংশে ঠিক। যদি আপ প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করতো, তবে সেই হাইপথেটিকাল পরিস্থিতিতেও বিজেপিই জয়লাভ করতো। তবে সেই জয় এতটা চমকপ্রদ হত না— সেক্ষেত্রে বিজেপির আসন সংখ্যা হত ১০২ ও কংগ্রেসের ৬৪।
আপকে অনেকেই মনে করে এটি শহুরে এবং মধ্যবিত্তদের দল। কিন্তু গুজরাটে আপ কংগ্রেসের প্রভাব বলয়ে অবস্থিত উপজাতি অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়েছে, গড়ে প্রায় ২১ শতাংশ। গোয়া নির্বাচনেও আপ কংগ্রেসের ভোট কাটুয়ার ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু তাই বলে আপকে ‘জাতীয় ভোট কাটুয়া পার্টি’ উপাধিতে ভূষিত করার আগে একবার ভেবে দেখা দরকার যে আমাদের দেশের প্রচলিত গণতান্ত্রিক নির্বাচনের নীতি মানলে দেশের যে কোনো রাজ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার যে কোনো দলেরই আছে। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে একটি ফ্যাসিস্ট পার্টি যখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে, এবং এটাও প্রমাণিত যে এই বিশেষ পরিস্থিতিতে বিজেপির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ না হলে দেশকে বাঁচানো যাবে না, তখন সামগ্রিক ঐক্যের স্বার্থে প্রতিটি দলকে কিছু ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত থাকা উচিত। কিন্তু আপ অথবা তৃণমূলের মতো দলগুলি এতটাই বিভাজনমূলক, যে গণতান্ত্রিক বিরোধী ঐক্যের চেয়ে তাদের কাছে নিজেদের নেতা অথবা নেত্রীর উচ্চাকাঙ্খাই একমাত্র বিবেচ্য। ফলে জাতীয় রঙ্গমঞ্চে তারা ভোট কাটুয়া হিসেবেই অবতীর্ণ হবে, বিজেপির শাসনকে দীর্ঘায়িত করবে এবং অবশেষে বিজেপির গ্রাসে পতিত হয়ে নিজেরা অস্তিত্বহীন হয়ে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে স্থান নেবে।
গুজরাটের ভোটের ফলাফল কী বলছে? যদিও ২০১৭ সালের তুলনায় এবারের ভোটে বিজেপির পক্ষে সমর্থন সারা গুজরাট জুড়েই প্রসারিত, তবু তার মধ্যে শ্রেণিগত ও জাতপাতগত বিভেদ রেখাটি স্পষ্টতই চোখে পড়ে। শিক্ষায় সমাজের যেসব অংশ যতো বেশি অগ্রণী, তাদের মধ্যে বিজেপি সমর্থকদের সংখ্যা ততো বেশি। এবং যারা যতো বেশি সম্পন্ন অথবা উচ্চবর্ণ জাত, শিক্ষা ততো বেশি পরিমাণে তাদের কাছে উপলব্ধ। আবার শিক্ষার আলো থেকে যারা যতো বেশি বঞ্চিত, ততো বেশি সংখ্যায় তারা কংগ্রেসকে সমর্থন করেছে। অনুরূপভাবে সমাজে যাদের অর্থনৈতিক স্ট্যাটাস যতো বেশি, বিজেপি তাদের থেকে ততো বেশি সমর্থন পেয়েছে। কংগ্রেসের ক্ষেত্রে বিপরীতটাই সত্য। অর্থাৎ দরিদ্রদের ভোট বিজেপির চেয়ে কংগ্রেস বেশি পেয়েছে। আবার জাতিগোষ্ঠির বিচারে সমর্থনের হিসেব করলে দেখা যাচ্ছে উচ্চবর্ণের ৬২% বিজেপিকে ও ২৫% কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে। পাতিদারদের মধ্যে এই বিভাজন যথাক্রমে ৬৪ ও ১৮%। দলিত ভোটের ক্ষেত্রে ৪৪ ও ৩২%। আদিবাসীদের ক্ষেত্রে যথাক্রমে ৫৩ ও ২৪%(আপ-২১%) এবং মুসলিমদের ভোটের ১৪% পেয়েছে বিজেপি ও ৬৪% পেয়েছে কংগ্রেস।
হিমাচলপ্রদেশ ও দিল্লি পুরসভা
গুজরাটে মোদীর সাফল্যের ঢক্কানিনাদে কান ঝালাপালা হলেও হিমাচলে পরাজয়ের গ্লানি ঢাকা পড়ে না। ভোটে আসন সংখ্যাই জয়ের মাপকাঠি। সেদিক দিয়ে দেখলে এই পরাজয় নির্ধারক তো বটেই। কিন্তু প্রাপ্ত ভোটের হিসেবে দেখা যাচ্ছে বিজেপির তুলনায় কংগ্রেস মাত্র ০.৯ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছে। তদুপরি হিমাচল একটি ছোট রাজ্য। এখানকার ভোটের প্রভাব দেশের রাজনীতিতে যে কম, একথা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু তার সঙ্গে একথাও ঠিক যে বিজেপি এই নির্বাচনে তাদের অর্থবল ও রাষ্ট্রযন্ত্রের ব্যবহার কিছু কম করেনি। এমনকি জনসংখ্যার মাত্র দুই শতাংশ মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও এখানেও অভিন্ন দেওয়ানী বিধি প্রবর্তন করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে হইচই ফেলার চেষ্টা করতে কসুর করেনি বিজেপি। তাদের উদ্দেশ্য সেই একই— মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সমস্যাবলী কিছুতেই যেন নির্বাচনী ইস্যু না হয়ে দাঁড়ায়। বলাবাহুল্য সেই প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পরাজয়ের প্রথম কারণ সেটাই। এছাড়াও হিমাচলে কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি কিছুটা রয়েছে। এখানেও বিজেপির সাহায্যার্থে ভোট কাটুয়া আপও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিল, কিন্তু এক শতাংশের কম ভোট পেয়ে নির্বাচনে তারা কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি।
মূল্যবৃদ্ধি ও কর্মহীনতা ভোটে নির্ধারক প্রভাব ফেলেছে। ভোটারদের মধ্যে ৭৬ শতাংশ ধর্মকে খুব কম অথবা আদৌ কোনো ইস্যু মনে করেনি। বরং দারিদ্র এই ভোটে বড় ইস্যু হয়ে দেখা দিয়েছে। তাই দরিদ্রদের ভোটের ৫১% পেয়েছে কংগ্রেস এবং বিজেপি ৩৮%। অন্যদিকে ধনীদের মধ্যে বিজেপির প্রাপ্ত ভোট বেশি ও কংগ্রেসের কম, যথাক্রমে ৪৬ ও ৪০%। জাতপাতের বিচারেও বিজেপিকে বেশি সমর্থন করেছে ব্রাহ্মণ ৪৮, রাজপুত ৪৯, অন্যান্য উচ্চবর্ণ ৫৪%, যেখানে কংগ্রেস পেয়েছে যথাক্রমে ৩৩, ৪০ ও ৩৪%। কিন্তু ওবিসিদের ৫৮% ও দলিতদের ৫৩% কংগ্রেসকে ভোট দিয়েছে, বিজেপিকে দিয়েছে যথক্রমে ৩৬ ও ৩৪%।
তবে হিমাচলের নির্বাচনী ফলাফলে কংগ্রেসের জন্য একটি সাবধানবাণী নিহিত রয়েছে। আগামী দেড় বছরে হিমাচলের প্রশাসন যদি এমন কিছু উল্লেখযোগ্য কার্যকারিতা প্রমাণ করতে না পারে যাতে বিজেপি প্রশাসনের চেয়ে তাদের পৃথক অভাবে চিহ্নিত করা না যায়, তাহলে তাদের আয়ু পাঁচ বছর টিঁকবে কিনা সন্দেহ।
এদিক দিয়ে দিল্লির সংযুক্ত পুরসভার নিচনী চিত্রটি কৌতুহলোদ্দীপক। একে রাজধানী শহর, তার ওপরে মোদীর শাসন কেন্দ্র। দিল্লি বিধানসভার নির্বাচনী ফলাফলের নিরিখে আপ দলে আসন সংখ্যা ১৬০-এর কাছাকাছি হওয়া উছিত ছিল, যা হয়নি। আপের প্রাপ্ত ভোট বিজেপির চেয়ে মাত্র তিন শতাংশ বেশি । ঘোড়া কেনাবেচায় দক্ষ বিজেপির সাথে টক্কর নেওয়া কঠিন। তদুপরি লেফটেন্যান্ট গভর্নরের হাতে রয়েছে ১২ সদস্যকে মনোনয়ন দেওয়ার অধিকার। ফলে মেয়র নির্বাচন আপের পক্ষে সহজ হবেনা। দুর্নীতি থেকে মুক্ত প্রশাসন দেওয়ার যে অঙ্গীকার করে আপ দিল্লীতে ক্ষমতায় এসেছিল সেসব কথা আর কেজরীয়ালের মুখে শোনা যায় না। তাছাড়া ২০২০ সালের দিল্লী দাঙ্গায় কেজরী প্রশাসনের মুসলিমদের প্রতিভূমিকা মোটেও উজ্জ্বল নয়। তাই এবারে নর্থ-ইষ্ট দিল্লি থেকে আপকে খালিহাতে ফিরতে হয়েছে। বিখ্যাত শাহিনবাগেও তাই। হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির বিচারে আপ কার্যত বিজেপির বি-টিমে পরিণত হয়েছে। পরিষেবা দেওয়ার আশায় আপ ১৫ বছরের বিজেপি অপদার্থতার থে ভিন্নতর ভূমিকা পালন করবে এই আশায় দিল্লিবাসী আপকে ভোট দিয়েছে। আপ ক্ষমতার গন্ধে এমনই মাতোয়ারা যে কটা কী তারা করবে সেটা নজরে থাকবে সবার। অবশ্য সেই পারফর্মেন্স দিয়ে ২০২৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের ভায় নির্ধারিত হবে না। সেটা অন্য খেলা।
ঋণ: দ্য হিন্দু, সিএসডিএস-লোকনীতি সমীক্ষা
— মতামত লেখকের নিজস্ব
প্রকাশের তারিখ: ১৭-ডিসেম্বর-২০২২
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
