Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

অস্বস্তির ছবি ভয়েস অফ হিন্দ রাজাব

তর্পণ সরকার
গত তিনবছরে প্যালেস্তাইনের শিশুদের পরিণতি গোটা বিশ্বের চোখের সামনেই ঘটছে।... যুদ্ধের বীভৎসতার দৃশ্য আমাদের যে খুব বিচলিত করে, একথাও আর বলা যায় না। নৈশাহারের সাথে টেলিভিশনে যুদ্ধ দেখতেও মানব জাতি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে প্রায় অর্ধ শতক ধরে। সামাজিক মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তে সেই যুদ্ধের ছবি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ।... কিন্তু তারপরেও কিছু এমন দৃশ্যের জন্ম হয় যা আমাদের থমকে দেয়। যেমন দিয়েছিল সমুদ্রের ধারে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা আইলান কুর্দির ছবি।
Voice of Hind Rajab

ছ-বছরের বাচ্চা মেয়েটা ভালবাসতো সমুদ্র। ভূমধ্যসাগরের নীল জল। ভালোবাসতো সৈকতের সোনালি বালি নিয়ে খেলতে। সাথে পরিবার, পরিজন। আর দশটা শিশুর মতোই রোদে-হাওয়ায় বেড়ে উঠত হয়ত ছ-বছরের হিন্দ রাজাব। যদি না তার জন্ম হত গাজা ভূখণ্ডে। তার জীবন এগিয়েছে কুড়ি হাজার প্যালেস্তিনীয় শিশুর মতো। যাদের কুঁড়ি অবস্থাতেই ঝরে যেতে হয়েছে এ পৃথিবির বুক থেকে।

ভারতে সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে এবছরের অস্কারের সেরা ছবির দৌড়ে থাকা টিউনিশিয়ান পরিচালক কাওথার বেন হানিয়া পরিচালিত ডকুফিচার ভয়েস অফ হিন্দ রাজাব। মৌখিকভাবে নিষিদ্ধ করার পর অবশেষে বিরোধী সাংসদ, চিত্রনির্মাতা, রাজনৈতিক কর্মীদের চাপে পড়ে ছবিটিকে সার্টিফাই করেছে সেন্সর বোর্ড। খুবই অল্প কিছু প্রেক্ষাগৃহেই দেখা যাচ্ছে। এই রাজ্যে, শুধু কলকাতাতেই। তাও মাত্র দুটি মাল্টিপ্লেক্সে।


ছবিটির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট

উননব্বই মিনিটের ছবিটি তৈরি হয়েছে ২০২৪-এর ২৯ জানুয়ারি প্যালেস্তাইন রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির (পিআরসিএস) হেল্পলাইনে আসা একটি ফোন কলের ভিত্তিতে। কলসেন্টারের এজেন্টদের সাথে ছ-বছরের হিন্দ রাজাবের কথোপকথনই ছবিটির চিত্রনাট্য। ফোনে হিন্দ রাজাব সাহায্য চাইছিল। তাদের গাড়িতে হামলা করেছিল ইজরায়েলের বাহিনী। সেই গাড়িতে তার পরিবারের ছ-জনের মৃতদেহের সাথে আটকে ছিল সে। উদ্ধারকারী দল, অ্যাম্বুলেন্স ছিল মাত্র আট মিনিট দূরত্বে। বেশ কয়েক ঘন্টার ‘কো-অর্ডিনেশন’এর পর সেই অবরুদ্ধ ভূমিতে উদ্ধারের ছাড়পত্র পায় দলটি। তাতেও শেষরক্ষা হয়নি। বারো দিন পর অবরোধ উঠলে দেখা যায় ৩৫৫টি বুলেট বিদ্ধ হিন্দ রাজাবদের পরিবারের গাড়িতে সাতটি মৃতদেহ। তার থেকে মাত্র পঞ্চাশ মিটার দূরে উদ্ধারকারী দলের অ্যাম্বুলেন্স। সেটিও বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত। তার ভিতরে পিআরসিএস-এর দুজন কর্মী

গত তিনবছরে প্যালেস্তাইনের শিশুদের পরিণতি গোটা বিশ্বের চোখের সামনেই ঘটছে। তাই এখানে আলাদা করে ছবিটির নতুন কোনও তথ্য যোগ করার কথাও ছিল না। তা করেও নি। যুদ্ধের বীভৎসতার দৃশ্য আমাদের যে খুব বিচলিত করে, একথাও আর বলা যায় না। নৈশাহারের সাথে টেলিভিশনে যুদ্ধ দেখতেও মানব জাতি অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে প্রায় অর্ধ শতক ধরে। সামাজিক মাধ্যমের বাড়বাড়ন্তে সেই যুদ্ধের ছবি এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ। বাচ্চারাও নিজেদের বন্ধুকে ভার্চুয়াল দুশমন সাজিয়ে গুলি করতে শিখে গেছে ভিডিও গেমে। কিন্তু তারপরেও কিছু এমন দৃশ্যের জন্ম হয় যা আমাদের থমকে দেয়। যেমন দিয়েছিল সমুদ্রের ধারে মুখ গুঁজে পড়ে থাকা আইলান কুর্দির ছবি। 

পরিচালক কাওথার বেন হানিয়া তাঁর ছবির দর্শকদের বন্দি করে ফেলেন কাঁচের দেওয়াল, ঝকঝকে মেঝে, উন্নত যন্ত্রপাতিতে ভরা এক কলসেন্টারে। যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত শহরের প্রায় বিপরীত দৃশ্যপট (mise en scène) দর্শকদের সামনে হাজির হয়। সেখানেই ফোনে ভেসে আসে হিন্দ রাজাবের গলার স্বর। ফোনেই শোনা যায় ট্যাংক আসার শব্দ, গুলি চলার শব্দ। একজন এজেন্ট হিন্দ-কে বোঝানোর চেষ্টা করে তার পাশে পরিবারের বাকিরা ঘুমোচ্ছে, তাদের যেন সে বিরক্ত না করে। কিন্তু সেই মোলায়েম শিশু ভুলানো রূপকথার বুননকে নিমেষে ছিঁড়েখুঁড়ে দেয় হিন্দের সহজ উত্তর “ওরা মরে গেছে। আমাকে বাঁচাও।” ছবিতে ব্যবহৃত কথাগুলি কোনও তৈরি করা চিত্রনাট্য নয়। হিন্দ রাজাবের সাথে হওয়া টেলিফনিক কথার কল রেকর্ডিং। দৃশ্যপটে যুদ্ধের ভাংচুর না দেখিয়েও ছবিতে যে ট্রিটমেন্ট পরিচালক করেছেন তা দর্শকের চেতনায় এক চোরাগোপ্তা আঘাত করে। ছবিতে পিআরসিএস এজেন্টদের অসহায়তা থেকে বারবার মেজাজ হারাতে দেখা যায়। মাঠে কাজ করা তাদের সহকর্মীদের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। উদ্ধারে যেতে অনুমতি পাওয়া যায় না। কীভাবে সেনা উন্নত যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে ‘খুন’ করছে সেটা একজন এজেন্ট আরেকজনকে জানায়। জায়নবাদী সেনার আগ্রাসনের উল্টোদিকে সীমিত সামর্থ আর অফুরন্ত উদ্যম যে একটা পর্যায়ের পর কার্যকরী নয়, সেই কথাই যেন তাদের আচরণে ঝরে পড়ে। একইরকম অসহায়তা ছেয়ে যায় দর্শকদের মধ্যেও। হিন্দ রাজাবের বারবার ছোট্ট আর্তি “আমাকে নিয়ে যাও, বাঁচাও” একজনের আর্তি থাকে না। কানে বাজতে থাকে ছবি শেষ হওয়ার পরেও। দর্শককেও আটকে পড়তে হয় ওই কাঁচের দেওয়াল, ঝকঝকে মেঝের কলসেন্টারে। 


পিআরসিএস এজেন্টরা ফোন কলে থাকাকালীন মৃত্যু হয়েছে, এমন মানুষদের ছবি আর আটকে রাখে অফিসের একটি বোর্ডে। আর নাম বা ছবি জানার সুযোগ না হলে অর্থাৎ ফোনে যথেষ্ট সময় কথা বলার আগেই মারা গেলে একটা ফাঁকা কাগজে শুধু একজন মানুষের অবয়বের ছবি আটকে রাখে। এই বোর্ডটি যেন হয়ে ওঠে প্যালেস্তাইনে জায়নবাদী-সাম্রাজ্যবাদীদের যৌথ হামলায় মৃত অসংখ্য নাম না জানা মানুষের স্মৃতির কোলাজ। হিন্দ রাজাবকে কখনই দেখা যায়নি। দেখা যায়নি তার ভয়ে কুঁকড়ে থাকা মুখ। বরং বারবার করে ক্যামেরার সামনে এসেছে হিন্দ রাজাবের হাসিখুশি ফটোগ্রাফ; যা পিআরসিএস-কে তার পরিবারের লোকেরা পাঠিয়েছে। তাই ছবিতে চোখে দেখা যাচ্ছে হাসিখুশি বাচ্চা মেয়ের ছবি আর কানে শোনা যাচ্ছে তার ভীত সন্ত্রস্ত কণ্ঠ। পরিচালকের এই প্রয়োগ দর্শকদের গোটা ছবি জুড়ে একটা অস্বস্তির মধ্যে রেখে দেয়। 

এই অস্বস্তিটুকুই হয়ত এই ছবির গন্তব্য। হয়ত ছবির নাম হতে পারত ডেথ অফ হিন্দ রাজাব, তাতে নামের মধ্যেও ট্র্যাজেডি থাকত। বা নাম হতে পারত লাইফ অফ হিন্দ রাজাব, ওইটুকু জীবনের মহিমা প্রকাশ হত। কিন্তু ভয়েস অফ হিন্দ রাজাব হয়ে হিন্দ রাজাবের স্বরকে অমর করে দেওয়া হয়েছে। ছবির সাথে দর্শকের যেটুকু নৈর্ব্যক্তিক দূরত্ব, তাও মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে। হিন্দের কণ্ঠ আমাদের জাগিয়ে রাখুক। হিন্দ ভালোবাসতো নীল সমুদ্র, তার তীরে খেলতে। তার থেকে এই নিষ্পাপ ক্রীড়াঙ্গণ কেড়ে নিল যারা—তাদের কানেও যেন সারাজীবন হিন্দের গলার স্বর বাজে। হিন্দের গলা যেন সারাজীবন তাড়া করে বেড়ায় যুদ্ধবাজ নেতাদের। আর আমরা যারা এখনও এই পৃথিবীর আলো হাওয়ায় বেঁচে আছি, বৃষ্টির মিঠে জল আর সমুদ্রের নোনাজল হাতে মাখতে পারছি—তাদেরও যেন হিন্দের গলার স্বর ঘুমোতে না দেয়—যুদ্ধ না থামা অবধি। 

হিন্দ রাজাবের হত্যা নিয়ে আল জাজিরা-র তরফে ফরেনসিক আর্কিটেকচারের তদন্তের বিশদ বিবরণ দেখে নিন : হিন্দ রাজাবের হত্যার তদন্ত


প্রকাশের তারিখ: ০৪-জুলাই-২০২৬
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
নানা প্রসঙ্গ বিভাগে প্রকাশিত ১০২ টি নিবন্ধ
০৪-জুলাই-২০২৬

৩০-জুন-২০২৬

২৪-জুন-২০২৬

১১-জুন-২০২৬

১০-জানুয়ারি-২০২৬

২১-ডিসেম্বর-২০২৫

২০-ডিসেম্বর-২০২৫

২৫-নভেম্বর-২০২৫

০৮-সেপ্টেম্বর-২০২৫

২৩-ফেব্রুয়ারি-২০২৫