Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

লেনিন কীভাবে মার্কস পড়েছিলেন (২)

নাদেঝদা ক্রুপস্কায়া
... এ কথা বুঝতেই হবে যে কোনও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বা কোনও বস্তুবাদ কখনই একটা সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তি ছাড়া বুর্জোয়া চিন্তাধারার আক্রমণ, বা বুর্জোয়া বিশ্বদৃষ্টির বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রতিষ্ঠা বজায় রাখতে পারবে না। সংগ্রামের মধ্যে আত্মরক্ষা করে এবং শেষ পর্যন্ত জয়যুক্ত হতে হলে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীকে হতে হবে এক আধুনিক বস্তুবাদী, মার্কস যার প্রতিনিধি সেই বস্তুবাদের সচেতন অনুগামী– অর্থাৎ তাকে হতে হবে দ্বান্দিক বস্তুবাদী।
How Lenin Read Marx (2)

‘বিপ্লব হল ইতিহাসের গতিসঞ্চারক যন্ত্র’, বলেছিলেন মার্কস। ঘনায়মান বিপ্লবের ভূমিকা বিচারে লেনিন এই কথাটি উদ্ধৃত করেন। ‘নৈয়ে রাইনিশে ৎসাইতুং’ সংবাদপত্রে মার্কসের বক্তব্য বিস্তারিত বিশ্লেষণ করে লেনিন প্রলেতারিয়েত এবং কৃষক সম্প্রদায়ের বিপ্লবী গণতান্ত্রিক একনায়কত্বের অর্থ নির্ধারণ করেন। কিন্তু তিনি আমাদের বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের সঙ্গে তুলনা করে ১৮৪৮ সালের জার্মান বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের তফাত দেখান। তিনি লিখছেনঃ

‘এই ভাবে, মাত্র ১৮৪৯ সালের এপ্রিল মাসে, বিপ্লবী সংবাদপত্র প্রায় এক বছর যাবৎ প্রকাশিত হবার পরেই (‘নৈয়ে রাইনিশে ৎসাইতুং’ প্রকাশন আরম্ভ হয় ১৮৪৮ সালের জুন মাসে), মার্কস ও এঙ্গেলস একটি বিশেষ শ্রমিক সংগঠন প্রতিষ্ঠা সমর্থন করলেন! এতদিন পর্যন্ত ওঁরা শুধু ‘গণতন্ত্রের একটি মুখপত্র’ চালাচ্ছিলেন। স্বাধীন শ্রমিক পার্টির সঙ্গে তার কোনো সাংগঠনিক সম্পর্ক ছিল না! এই সত্যটি বর্তমান দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বিচার করলে অদ্ভুত ও অসম্ভব মনে হবে, কিন্তু এ থেকে অত্যন্ত স্পষ্ট বুঝতে পারা যায় তখনকার জার্মান সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক শ্রমিক পার্টির এবং বর্তমান রুশ সোশ্যাল-ডেমোক্রেটিক শ্রমিক পার্টির মধ্যে কী প্রচণ্ড তফাৎ। এ থেকে বোঝা যায়, জার্মান গণতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্যে আন্দোলনের প্রলেতারীয় বৈশিষ্ট্য ও তার ভিতর প্রলেতারীয় স্রোতধারা কত কম দেখা দিয়েছিল (এর কারণ ১৮৪৮ সালে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিকভাবে রাষ্ট্র হিসাবে তার সংহতির অভাব- জার্মানির পশ্চাৎপদ অবস্থা)’। [ভি আই লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ১ম খণ্ড, ২য় অধ্যায়, পৃঃ ১৪৮]

মার্কসের চিঠিপত্র এবং কার্যাবলী সম্বন্ধে ১৯০৭ সালে লেখা ভ্লাদিমির ইলিচের প্রবন্ধগুলি বিশেষ চিত্তাকর্ষক। প্রবন্ধগুলি হল ‘কুগেলমানকে লেখা মার্কসের পত্রাবলীর রুশ অনুবাদের ভূমিকা’ (১২শ খণ্ড, পৃঃ  ৮৩-৯১, রুশ ভাষায়), ‘দ্বিতীয় দুমা প্রসঙ্গে মেহরিংএর মত (১২শ খণ্ড, পৃঃ ৩৪৩-৩৪৯) এবং ‘ফ আ জোর্গে প্রভৃতিকে লেখা জ ফ বেকার, জ দিটসগেন, এঙ্গেলস, মার্কস ইত্যাদির পত্রাবলী’ র বইয়ের রুশ অনুবাদের ভূমিকা।’ (১২শ খণ্ড, পৃঃ ৩১৯-৩৩৮, ৪র্থ রুশ সংস্করণ)।

এই প্রবন্ধগুলি থেকে লেনিনের মার্কস পড়ার রীতির একটি নিখুঁত ছবি পাওয়া যায়। শেষেরটি অসাধারণ রকম মনোগ্রাহী। বোগদানভের সঙ্গে মতান্তরের পর লেনিন যখন আবার গভীরভাবে দর্শন পড়েন, যখন দ্বান্দিক বস্তুবাদের প্রশ্নটি বিশেষ গুরুত্ব সহকারে তাঁর চিত্ত আকর্ষণ করে, তখন এই প্রবন্ধটি লেখা।

বিপ্লবের পরাজয়ের পর রাশিয়ায় যে সব প্রশ্ন দেখা দেয়, তার সঙ্গে তুলনীয় প্রশ্নাদি সম্পর্কে এবং দ্বান্দ্বিক এবং ঐতিহাসিক বস্তুবাদ সম্পর্কে মার্কস কী বলেছেন, তা একই সঙ্গে পড়ে লেনিন মার্কসের কাছ থেকে শেখেন কী করে ঐতিহাসিক বিকাশ অনুধ্যানের ক্ষেত্রে দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের পদ্ধতি প্রয়োগ করতে হয়। ‘ফ আ জোর্গের পত্রাবলীর ভূমিকায়’ তিনি লিখেছেন: ‘ইংরেজ, মার্কিন ও জার্মান শ্রমিক আন্দোলন সম্বন্ধে মার্কস ও এঙ্গেলস যা বলেছেন তা তুলনা করে দেখা অত্যন্ত শিক্ষাপ্রদ। এই তুলনার গুরুত্ব আরও বেড়ে যায় যদি মনে রাখি যে, একদিকে জার্মানি ও অপর পক্ষে ইংল্যান্ড ও আমেরিকা পুঁজিবাদী বিকাশের বিভিন্ন পর্যায় এবং এই দেশগুলির সমগ্র রাজনৈতিক জীবনের উপর বুর্জোয়ার শ্রেণি-আধিপত্যের বিভিন্ন রূপের প্রতিভূ। বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে, এখানে দেখতে পাই বস্তুবাদী দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের একটি নমুনা, বিভিন্ন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যগুলির কথা মনে রেখে বিচার্য প্রশ্নটি বিভিন্ন দিক ও বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা ও তাদের উপর জোর দেওয়ার ক্ষমতা। শ্রমিক পার্টির ব্যবহারিক কর্মনীতি এবং রণকৌশলের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমরা এ ক্ষেত্রে দেখতে পাব, ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’-এর স্রষ্টারা কীভাবে বিভিন্ন দেশের জাতীয় শ্রমিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্বের সঙ্গে সামঞ্জস্য রক্ষা করে সংগ্রামী প্রলেতারিয়েতের কর্তব্য নিরূপণ করেছেন, তারই একটি নমুনা।’ [ভি আই লেনিন, মার্কস-এঙ্গেলস-মার্কসবাদ, মস্কো, পৃঃ ২৩৫]

১৯০৫এর বিপ্লবের ফলে কতগুলি নতুন, জরুরি প্রশ্ন দেখা দেয়, এবং সেগুলির সমাধানের জন্য লেনিন আরো গভীরভাবে মার্কস নিয়ে পড়াশুনা করেন। বিপ্লবের আগুনেই মার্কস অধ্যয়নের লেনিনীয় (খাঁটি মার্কসীয়) পদ্ধতি পোক্ত হয়ে ওঠে। মার্কস পড়ার এই পদ্ধতিই লেনিনকে মার্কসবাদ বিকৃতির বিরুদ্ধে, এর বিপ্লবী মর্মার্থকে ধ্বংস করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সংগ্রামের অস্ত্র জুগিয়েছিল। আমরা জানি লেনিনের ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ বইটি অক্টোবর বিপ্লব সংগঠন ও সোভিয়েত শাসন প্রতিষ্ঠার কাজে কী বিরাট ভূমিকা গ্রহণ করে। এই বইটি রাষ্ট্র সংক্রান্ত মার্কসের বিপ্লবী তত্ত্বের গভীর অধ্যয়নের ভিত্তিতে লেখা। লেনিনের ‘রাষ্ট্র ও বিপ্লব’ বইটির প্রথম পৃষ্ঠাটি দেখা যাক:

‘মার্কসের শিক্ষামালার এখন যে অবস্থা, মুক্তি-সংগ্রামী, অত্যাচারিত শ্রেণিগুলির বিপ্লবী মনীষী এবং নেতাদের শিক্ষামালার যে হাল বারবার ইতিহাসে হয়েছে সেই একই অবস্থা এখন ঘটছে মার্কসের শিক্ষামালার বেলায়। বড়ো বড়ো বিপ্লবীদের জীবদ্দশায় উৎপীড়ক শ্রেণিগুলি অবিরত তাঁদের তাড়না করে ফিরেছে, তাঁদের শিক্ষাগুলির প্রতি প্রদর্শন করেছে বর্বর ক্রুরতা ও প্রচণ্ড ঘৃণা, চালু করেছে মিথ্যা ও অপবাদের দ্বিধাহীন অভিযান। তারপর তাঁদের মৃত্যুর পর চেষ্টা হয়েছে তাঁদের নিরীহ পূজার মূর্তিতে পরিণত করতে, বলা যেতে পারে, যেন সাধুসন্ত বানিয়ে উৎপীড়িত শ্রেণিগুলির ‘সান্ত্বনার’ জন্যে এবং তাদের ভোলাবার উদ্দেশে তাদের নামের চারদিকে একটা জ্যোতি আরোপ করতে এবং সেই সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের শিক্ষামালার সারবস্তুটিকে ধ্বংস করে বিপ্লবী তীক্ষ্ণতা ভোঁতা করে দিয়ে তাকে বিকৃত করে তুলতে। বর্তমানে বুর্জোয়ারা ও শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনের অন্তর্বর্তী সুবিধাবাদীরা মার্কসবাদের উপর এইভাবে ‘খোদকারি’ চালাতে একমত। এই শিক্ষামালার বিপ্লবী দিকটাকে, তার বিপ্লবী আত্মাকে তারা একেবারে বিসর্জন দেয়, মুছে ফেলতে চায়, বিকৃত করে তোলে। যেসব কথা বুর্জোয়াদের গ্রহণযোগ্য, অন্তত গ্রহণযোগ্য বলে মনে হয়, সেইগুলিই তারা সামনে নিয়ে আসে ও তার জয়গান করে। যত সমাজতন্ত্রী-জাত্যাভিমানি সকলেই এখন ‘মার্কসবাদী’ হয়েছে, ঠাট্টা নয়! জার্মান বুর্জোয়া পণ্ডিতরা, যারা কাল পর্যন্তও মার্কসবাদ উৎখাতের কাজে বিশেষজ্ঞতা অর্জন করেছিল তারা এখন ক্রমশই ঘন ঘন ‘জাতীয়-জার্মান’ মার্কসের কথা আওড়াচ্ছে। তাদের বক্তব্য, লুটতরাজি যুদ্ধের জন্য যে শ্রমিক ইউনিয়নগুলো চমৎকার করে সংগঠিত হয়ে উঠেছে তাদের নাকি শিক্ষা দিয়েছিলেন মার্কস!

‘এই অবস্থায়, মার্কসবাদের বহুব্যাপ্ত অভূতপূর্ব বিকৃতির সামনে আমাদের সর্ব প্রধান কাজ হল রাষ্ট্র বিষয়ে মার্কস সত্যই কী শিক্ষা দিয়েছিলেন তার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।’ [ভি আই লেনিন, সংকলিত রচনাবলী, ২য় খণ্ড, ১ম অধ্যায়, পৃঃ ২০২-২০৩]

‘লেনিনবাদের সমস্যায়’ কমরেড স্তালিন বলেছেন: ‘কেবল পরবর্তী পর্বেই, প্রলেতারিয়েতদের প্রত্যক্ষ সংগ্রামের পর্বেই, প্রলেতারীয় বিপ্লবের কালেই, বুর্জোয়াদের উচ্ছেদের প্রশ্নটা যখন আশু কর্তব্যের প্রশ্ন হয়ে ওঠে, যখন প্রলেতারিয়েতের সহায়ক বাহিনীর প্রশ্নটা (রণনীতি) সবচেয়ে বড় হয়ে ওঠে, যখন সংগ্রাম এবং সংগঠনের সবকটি রূপ- পার্লামেন্টারি ও পার্লামেন্ট-বহির্ভূত (রণকৌশল)—  সম্পূর্ণ আত্মপ্রকাশ করেছে এবং সুনির্দিষ্ট হয়ে উঠেছে, কেবল সেই যুগেই প্রলেতারীয় সংগ্রামের একটা অখণ্ড রণনীতি এবং বিস্তারিত রণকৌশল গড়ে তোলা যায়—  ঠিক এই যুগেই রণকৌশল ও রণনীতি সম্পর্কে মার্কস ও এঙ্গেলসের চমৎকার যে সব ভাবনা দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সুবিধাবাদীরা চেপে রেখেছিল, লেনিন তা দিনের আলোর টেনে আনেন। মার্কস ও এঙ্গেলসের রণকৌশলগত কয়েকটি বক্তব্য শুধু পুনরুদ্ধার করার কাজেই লেনিন নিজেকে সীমিত রাখেননি, তিনি তাদের আরও বিকাশিত করেন, আরও নতুন ভাবনা ও বক্তব্য সংযোজন করেন, এবং প্রলেতারীয় শ্রেণি সংগ্রামের নেতৃত্বের নিয়মাবলী ও পরিচালন নীতির ব্যবস্থা ধারায় তাদের সম্মিলিত করে তোলেন।’

মার্কস ও এঙ্গেলস লিখেছেন, ‘আমরা যা প্রচার করেছি তা গুরুবাক্য কিছু নয়, কর্ম সাধনের পথসূচক মাত্র।’ লেনিন বারবার এই কথাগুলির উপর জোর দিয়েছেন। মার্কস ও এঙ্গেলসের রচনা পাঠের পদ্ধতি, বিপ্লবী কর্ম, প্রলেতারীয় বিপ্লবের যুগের সমগ্র আবহাওয়াটাই লেনিনকে সাহায্য করেছে মার্কসের বিপ্লবী তত্ত্বগুলিকে কর্মসাধনের সত্যকার পথসূচক করে তুলতে।

এবার চূড়ান্ত গুরুত্বের একটি প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে চাই। সম্প্রতি আমরা সোভিয়েত ক্ষমতার পঞ্চদশ বার্ষিকী উদযাপন করেছি। এই প্রসঙ্গে ১৯১৭ সালের অক্টোবর মাসে ক্ষমতা অধিকারের কাজটি কী ভাবে সংগঠিত হয়েছিল তাও স্মরণ করেছি। এটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়নি। লেনিন পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে পরিকল্পনা করে রেখেছিলেন, এই ব্যাপারে তিনি অভ্যুত্থান সংগঠনে মার্ক্সের নির্দেশাবলী দ্বারা পরিচালিত হন।

অক্টোবর বিপ্লব প্রলেতারিয়েতের হাতে একনায়কত্ব তুলে দেয়, সংগ্রামের পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটায়। লেনিন মার্কস ও এঙ্গেলসের থিসিসের অক্ষর মান্য না করে তাদের বিপ্লবী প্রেরণায় পরিচালিত হয়েছিলেন বলেই প্রলেতারীয় একনায়কত্বের যুগে সমাজতান্ত্রিক পত্তনের কাজে মার্কসবাদ প্রয়োগ করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল।

আমি কয়েকটি উদাহরণ নিয়ে আলোচনা করি। লেনিন মার্ক্সের কাছ থেকে কী নিয়েছিলেন, কী ভাবে গ্রহণ করেছিলেন, বিপ্লবী আন্দোলনের কোন কর্তব্য প্রসঙ্গে কখন গ্রহণ করেছিলেন, তার বিচারের জন্য বিরাট গবেষণার প্রয়োজন। আমি জাতীয় সমস্যা, সাম্রাজ্যবাদ ইত্যাদি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি সম্পর্কে কিছুই বলিনি। লেনিনের রচনার একটি সম্পূর্ণ সংকলন, ‘লেনিনের বিবিধ সংকলন’ প্রকাশের ফলে এই কাজে বিশেষ সাহায্য হয়েছে। বিপ্লবী সংগ্রামের প্রতি পর্বে, প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত, মার্কস নিয়ে লেনিন কী পদ্ধতিতে কাজ করেছেন তার পর্যালোচনা করলে মার্কসকে নয় লেনিনকেও, এবং মার্কসের শিক্ষামালাকে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রয়োগের তাঁর পদ্ধতিটিকেও আরও ভালোভাবে বোঝার সহায়তা হবে।

লেনিনের মার্কস পড়ার আরও একটি দিক, বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ একটি দিক লক্ষ্য করার মতো। লেনিন যে শুধু মার্কস ও এঙ্গেলস ও তাঁদের ‘সমালোচকদের’ সব লেখাই পড়েছিলেন তা নয়, কিন্তু কোন পথে মার্কস তাঁর মতামতে এসে পৌঁছন, কোন কোন রচনা মার্কসের চিন্তায় আলোড়ন তুলে সে চিন্তাকে একটি বিশেষ দিকে পরিচালিত করেছিল সে বিষয়ে লেনিন অনুধ্যান করেন। লেনিন, বলতে গেলে, মার্কসীয় বিশ্বদৃষ্টিভঙ্গির উৎস পুস্তকগুলিও পড়েন, অন্যান্য লেখকদের কাছ থেকে মার্কস কী নিয়েছেন, কেমনভাবে নিয়েছেন তাও পাঠ করেন।

লেনিন দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের পদ্ধতি অতি ভালোভাবে চর্চা করেন। ‘জঙ্গী বস্তুবাদের তাৎপর্য প্রসঙ্গে’ (১৯২২) তাঁর প্রবন্ধে লেনিন লিখছেন যে, ‘পদজনামেনেম মার্কসিজমা’ (মার্কসবাদের পতাকাতলে– দার্শনিক পত্রিকা, ১৯২২ থেকে ১৯৪৪ মস্কোতে প্রকাশিত হয়) পত্রিকার কর্মীদের কর্তব্য বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের ধারাবাহিক চর্চার ব্যবস্থা করা। তাঁর মত ছিল একটি সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তি ছাড়া বুর্জোয়া চিন্তাধারার আক্রমণ বা বুর্জোয়া বিশ্বদৃষ্টির পুনঃপ্রতিষ্ঠা প্রতিহত করা সম্ভব নয়। তিনি তাঁর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে লিখেছিলেন বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের অধ্যয়ন কী ভাবে সংগঠিত করা যায়। প্রাসঙ্গিক অনুচ্ছেদটি এইঃ

‘... এ কথা বুঝতেই হবে যে কোনও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান বা কোনও বস্তুবাদ কখনই একটা সুদৃঢ় দার্শনিক ভিত্তি ছাড়া বুর্জোয়া চিন্তাধারার আক্রমণ, বা বুর্জোয়া বিশ্বদৃষ্টির বিরুদ্ধে সংগ্রামে প্রতিষ্ঠা বজায় রাখতে পারবে না। সংগ্রামের মধ্যে আত্মরক্ষা করে এবং শেষ পর্যন্ত জয়যুক্ত হতে হলে, প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীকে হতে হবে এক আধুনিক বস্তুবাদী, মার্কস যার প্রতিনিধি সেই বস্তুবাদের সচেতন অনুগামী– অর্থাৎ তাকে হতে হবে দ্বান্দিক বস্তুবাদী। এই লক্ষ্যে পৌঁছোবার জন্য ‘পদ জনামেনেম মার্কসিজমা’ পত্রিকার কর্মীদের কর্তব্য বস্তুবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের অর্থাৎ যে দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব মার্কস তাঁর ‘পুঁজি’ গ্রন্থে এবং ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক রচনায় ব্যবহারিকভাবে প্রয়োগ করেছেন তার ধারাবাহিক চর্চা করতে হবে … বস্তুবাদী অর্থে প্রতীত হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব মার্কস যে পদ্ধতিতে প্রয়োগ করেছেন তাকে আমাদের ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করে, আমরা পারি এবং আমাদের উচিত এই দ্বান্দ্বিক তত্ত্বকে সমস্ত দিক থেকে বিস্তারিত করা, হেগেলের প্রধান প্রধান রচনা থেকে অংশ বেছে পত্রিকায় ছাপানো, বস্তুবাদ অনুসারে তাদের ব্যাখ্যা করা এবং মার্কস যেভাবে দ্বান্দ্বিক তত্ত্ব প্রয়োগ করেছেন তার দৃষ্টান্ত তথা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্কের দৃষ্টান্ত থেকে এগুলির ওপর মন্তব্য করা। সাম্প্রতিক কালের ইতিহাসে, বিশেষত বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ ও বিপ্লবের মধ্যে এই ধরনের দৃষ্টান্তের অসাধারণ প্রাচুর্য। আমার মতে ‘পদজনামেনেম মার্কাসিজমা’ পত্রিকার লেখক ও সম্পাদকমণ্ডলীর হওয়া উচিত এক ধরনের ‘হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের বস্তুবাদী মিত্রসংঘ। বর্তমান প্রাকৃতিক বিজ্ঞানীরা (যদি তারা সন্ধান করতে পারে আর আমরা যদি তাদের সাহায্য করতে শিখি) বস্তুবাদী অর্থে ব্যাখ্যাত হেগেলীয় দ্বান্দ্বিক তত্ত্বের মধ্যে জবাব পাবে এমন একরাশ দার্শনিক সমস্যার যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে বিপ্লবের ফলে দেখা দিচ্ছে, এবং বুর্জোয়া ফ্যাশনের বুদ্ধিজীবি ভক্তরা যার ফলে ‘পা হড়কে’ পড়ছেন প্রতিক্রিয়ার মধ্যে।’ [ভি আই লেনিন, মার্কস-এঙ্গেলস-মার্কসবাদ, মস্কো, পৃঃ ৬১২-৬১৩]

‘লেনিনের বিবিধ সংকলন ৯ম ও ১২শ খণ্ড এখন প্রকাশিত হয়েছে। তাতে হেগেলের মূল রচনাগুলি বিশ্লেষণের সময় লেনিনের চিন্তাধারার সমগ্র প্রক্রিয়াটা উদ্ঘাটিত হয়েছে, তা থেকে দেখা যাবে তিনি হেগেল চর্চার সময় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের পদ্ধতি কী ভাবে প্রয়োগ করেছেন, হেগেল চর্চার সঙ্গে তিনি কী ভাবে মার্ক্সের গভীর চর্চা এবং অতি বিভিন্নতম অবস্থার মধ্যে মার্কসবাদকে কর্মসাধনের পথসূচক করতে পারার ক্ষমতাকে মিলিয়ে নিয়েছিলেন।

কিন্তু লেনিন কেবলমাত্র হেগেল চর্চাই করেছিলেন, তা নয়। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তিনি ১৮৫৮-এর ১লা ফেব্রুয়ারি, লেখা মার্কসের চিঠি পড়েছিলেন, মার্কস ঐ চিঠিতে লাসালের ‘ইফেসাসের তামসিক হেরাক্লিটাসের দর্শন’ (২য় খণ্ড) বইটির তীব্র সমালোচনা করে বলেন ওটা ‘কাঁচা’ কাজ। প্রারম্ভে লেনিন মার্কসের অভিমত সংক্ষেপে সূত্রবদ্ধ করেছেন এইভাবে ‘লাসাল কেবলমাত্র হেগেলের পুনরাবৃত্তি করেছেন, নকল করেছেন, হেরাক্লিটাসের কয়েকটি অংশ সম্পর্কে হেগেলের বক্তব্য লক্ষ বার চর্বিত-চর্বণ করেছেন, এবং লেখাটি অবিশ্বাস্য পরিমাণে অতিবুদ্ধি পণ্ডিতী বাগাড়ম্বরে বোঝাই করেছেন।’ [লেনিনের বিবিধ সংকলন, রুশ সংস্করণ, ১২শ খণ্ড, পৃঃ ২৯৫] তৎসত্ত্বেও লেনিন লাসালের এই রচনা পড়েন, তার একটি সংক্ষিপ্তসার করেন, কিছু অংশ বেছে লিখে রাখেন এবং নিজের মন্তব্য যোগ করে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্তে উপনীত হন: ‘মোটের উপর মার্কসের অভিমতই ঠিক। লাসালের বই পড়বার যোগ্য নয়।’ কিন্তু এই বইটি বিচার করার ফলে লেনিন মার্কসকে আরও ভালোভাবে বুঝতে পারেন, মার্কস কেন বইটি পছন্দ করেননি বুঝতে সক্ষম হন।

উপসংহারে লেনিনের মার্কস চর্চার আর একটি দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই—  মার্কসবাদকে জনপ্রিয় করার জন্য তাঁর কাজ। যিনি জনপ্রিয় করতে যাচ্ছেন তিনি নিজেই অনেক কিছু শিক্ষা লাভ করেন, যদি তিনি সে কাজ গ্রহণ করেন গুরুত্ব সহকারে এবং সবচেয়ে সরল এবং অত্যন্ত সহজবোধ্য ভাষায় কোনো তত্ত্বের মূল কথাটা বোঝাতে যান।

লেনিন সর্বদাই অতি গুরুত্ব সহকারে এই কাজটি গ্রহণ করতেন। নির্বাসন কালে প্লেখানভ এবং আক্সেলরডকে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন, কী করে শ্রমিকদের জন্যে লিখতে হয় তা শেখার জন্যে তাঁর যতটা আগ্রহ এমন আর কিছুতে নয়। মার্কসবাদকে তিনি শ্রমিক জনগণের বোধগম্য করে তুলতে চেয়েছিলেন।

১৮৯০ এর দশকে মার্কসীয় চক্রে কাজ করার সময় তিনি সর্বপ্রথমে ‘পুঁজি’ বইটির প্রথম খণ্ড ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেন শ্রোতাদের জীবন থেকে উদাহরণ নিয়ে। ১৯১১ সালে লজুমো (প্যারির কাছে) পার্টি স্কুলে আসন্ন বিপ্লবী আন্দোলনের নেতাদের ট্রেনিং দেওয়ার সময় লেনিন শ্রমিকদের কাছে রাজনৈতিক অর্থশাস্ত্রের উপর বক্তৃতা দিতেন এবং মার্কসবাদের মূলে সূত্রগুলিকে যথাসম্ভব সহজ করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করতেন। ‘প্রাভদা’র প্রবন্ধগুলিতে লেনিন মার্কসবাদের বিভিন্ন দিক জনপ্রিয় করে তোলার চেষ্টা করেছেন। ১৯২১ সালে ট্রেড ইউনিয়ন সম্বন্ধে বিতর্কে দ্বান্দিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিভিন্ন বিষয় ও ঘটনাবলীর বিচার প্রসঙ্গে লেনিন যা বলেন, সেটি তাঁর জনপ্রিয়করণের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ‘কেউ যদি কোনো বিষয় সত্যিই জানতে চায়’, লেনিন বলেছেন, ‘তবে বিষয়টিকে চারিপাশ থেকেই দেখতে হবে, তার প্রতিটি দিক প্রতিটি সম্পর্ক এবং ‘অন্তর্বর্তী যোগাযোগের’ বিচার করতে হবে। এ কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন করতে আমরা কখনই সক্ষম হব না, কিন্তু এ জাতীয় পরিপূর্ণ বিচারের ফলে ভুল ও অনড়তা এড়াতে পারব। এই হল প্রথম কথা। দ্বিতীয় কথা, দ্বান্দ্বিক যুক্তির দাবি হল একটা জিনিসকে দেখতে হবে তার বিকাশের মধ্যে, (হেগেল মাঝে মাঝে যা বলতেন) সেই ‘আত্ম-গতি’র মধ্যে, তার পরিবর্তনের মধ্যে। তৃতীয় কথা, কোনও একটা বিষয়ের পরিপূর্ণ ‘সংজ্ঞার’ মধ্যে নিহিত করতে হবে সমগ্র মানবিক অভিজ্ঞতাটা- সত্যের একটা মাপকাঠি এবং বিষয়টির সঙ্গে মানুষের প্রয়োজনের যে সম্পর্ক তার ব্যবহারিক নির্ধারক, এই উভয়ের দিক থেকেই। চতুর্থ কথা, দ্বান্দ্বিক যুক্তির শিক্ষা হল, ‘পৃথিবীতে কোনো বিমূর্ত সত্য নেই, সত্য সর্বদাই মূর্ত’ হেগেল উদ্ধৃত করে যে কথাটা প্লেখানভ বলতে ভালোবাসতেন।’ [ভি আই লেনিন, রচনাবলী, ৪র্থ রুশ সংস্করণ, ৩২শ খণ্ড, পৃঃ ৭২ – ৭৩]

সর্বদাই দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের পদ্ধতি প্রয়োগ করে, সর্বদাই মার্কসের সঙ্গে ‘পরামর্শ’ করে, বহু বছর ধরে দার্শনিক প্রশ্নগুলি নিয়ে কাজ করে লেনিন যা লাভ করেছিলেন, উপরের কয়েকটি বাক্যই তার মূল কথা। ঘটনা বিচারে সাহায্য পেতে হলে যাকিছু অবশ্য প্রয়োজনীয় উপরের পঙক্তিটিতে সংক্ষেপে তাই বলা হয়েছে।

লেনিন যেভাবে মার্কস চর্চা করেছিলেন তা থেকেই বেরিয়ে আসে আমাদের কী ভাবে লেনিন চর্চা করতে হবে। তাঁর শিক্ষা মার্কসের শিক্ষার সঙ্গে অবিচ্ছিন্নভাবে জড়িত—  সে হল ক্রিয়মান মার্কসবাদ, সাম্রাজ্যবাদ ও প্রলেতারীয় বিপ্লবের যুগের মার্কসবাদ।

এই লেখাটি প্রকাশিত হয় ‘শিক্ষাদীক্ষা– বক্তৃতা ও প্রবন্ধের সংকলন’ বইটিতে।
প্রকাশকঃ প্রগতি প্রকাশন, মস্কো, অনুবাদঃ সুপ্রিয়া ঘোষ, সম্পাদনাঃ ননী ভৌমিক


প্রকাশের তারিখ: ২৬-ফেব্রুয়ারি-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫