Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

জে ডি বার্নালের ইতিহাসে বিজ্ঞান – একটি আলোচনা (পর্ব ১)

শ্যামাশীষ ঘোষ
শ্রেনিসমাজের প্রথম গঠন থেকেই, ভাববাদী এবং বস্তুবাদী, এই দুটি প্রধান বিরোধী ধারণার মধ্যে একটি ধারাবাহিক তাত্ত্বিক বিতর্ক চিহ্নিত করেছেন তিনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বস্তুবাদ দার্শনিকভাবে অপর্যাপ্ত ছিল কারণ এটি সমাজ ও তার পরিবর্তনের সাথে নিজেকে যুক্ত করেনি। মার্কস এবং তাঁর অনুসারীরা এগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বস্তুবাদের সম্প্রসারণ ও রূপান্তর করেছিলেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রথমে কার্যকরী হয়ে, দ্বান্দ্বিক মতবাদ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে।
J. D. Bernal's History of Science – A Discussion (Part 1)

১৯৫৪ সালে Science in History প্রকাশিত হয় এবং এরপর তিনটি সম্পাদনা হয়েছিল। প্রকাশের সময়টি গুরুত্বপূর্ণ। সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার বিপরীতে সোভিয়েত রাশিয়া, চীন এবং আরো কয়েকটি দেশে তখন একটি বিকল্প সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত। বার্নালের আলোচনায় তার উল্লেখ আছে। বইটিতে প্রাচীন সময় থেকে বইটির প্রকাশের সময়কালের মধ্যে বিজ্ঞান এবং সমাজের মধ্যে পারস্পরিক ক্রিয়া এবং ইতিহাসের ওপর বিজ্ঞানের প্রভাবের আলোচনা পাই আমরা। কৌশল এবং চিন্তার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অবদানের আলোচনায় বিজ্ঞানের ঐতিহাসিক চরিত্রটি প্রকাশ করেছেন তিনি।

এটি বিজ্ঞানের ইতিহাস নয়। এর চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হিসেবে তিনি বিজ্ঞানের প্রভাব থেকে সমাজে উদ্ভূত প্রধান সমস্যাগুলির উপলব্ধির দিকে আমাদের চালিত করেছেন। একটি দ্রুত পরিবর্তিত বিশ্বের একটি প্রাচীন সমাজ থেকে, যা স্মরণের বাইরে চলে গেছে, ধারণাগুলি অপরিবর্তিতভাবে নেওয়ার আশা খুবই কম। এখানেই বার্নাল জোর দিয়েছেন যে যত্ন নিয়ে আমাদের এই সমস্যাগুলির সমাধান করতে হবে, বিজ্ঞানকে সর্বোত্তম ফলাফলের জন্য ব্যবহার করার এবং বিকাশের উপায় খুঁজে বের করার প্রক্রিয়ার অনুশীলনে। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনায় চেষ্টা থাকবে সেইদিকে পাঠকের নজর আকর্ষণ করার। পুরো বইটির পাঠ অবশ্যই অনেক বেশি তৃপ্তি দেবে পাঠককে। ফেলে আসা সময়ের সরঞ্জাম, হাতিয়ার, পরীক্ষাগার ইত্যাদির অনেক পুরনো ছবি বা স্কেচ, কিছু ম্যাপ এবং সারণীর মাধ্যমে বইটিকে আরো প্রাণবন্ত করে তুলেছেন লেখক।         

প্রথম অধ্যায়টি বিজ্ঞানের আবির্ভাব ও চরিত্র বর্ণনার, যেখানে বার্নাল বিজ্ঞানকে একটি প্রতিষ্ঠান, একটি পদ্ধতি, জ্ঞানের একটি ক্রমবর্ধমান ঐতিহ্য, উৎপাদন ও উন্নয়নের একটি প্রধান কারণ, মহাবিশ্ব এবং মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করার জন্য একটি শক্তিশালী প্রভাব হিসাবে দেখিয়েছেন। সমাজতান্ত্রিক এবং পুঁজিবাদী দেশগুলির মধ্যে, সমাজে বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার, বিজ্ঞানের স্বাধীনতা, শিক্ষা এবং সাধারণ সংস্কৃতিতে বিজ্ঞানের স্থান, এইসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ভিন্ন অবস্থান তুলে ধরেছেন।

বিজ্ঞানের ক্রমসঞ্চয়নের প্রকৃতি হিসাবে বার্নাল দেখিয়েছেন, এটি নতুন তথ্য, সূত্র এবং তত্ত্বগুলির ক্রমাগত আবিষ্কার, সমালোচনা এবং প্রায়শই নির্মাণ বা ধ্বংসের ক্রমে এগিয়ে চলে এবং গড়ে তোলে বিজ্ঞানের ক্রমবর্ধমান একটি ইমারত। বিজ্ঞান সাধারণভাবে এগিয়েছে অর্থনৈতিক প্রয়োজনীয়তা থেকে উদ্ভূত সমস্যার সমাধানে এবং পূর্ববর্তী বৈজ্ঞানিক ধারণা থেকে উদ্ভূত হয়ে। বিজ্ঞানের মাধ্যমে মানুষের ক্ষমতার সম্প্রসারণ এইভাবে একটি প্রয়োজনীয় পারস্পরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে সামাজিক পরিবর্তনের সাথে।

শ্রেনিসমাজের প্রথম গঠন থেকেই, ভাববাদী এবং বস্তুবাদী, এই দুটি প্রধান বিরোধী ধারণার মধ্যে একটি ধারাবাহিক তাত্ত্বিক বিতর্ক চিহ্নিত করেছেন তিনি। উনিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত বস্তুবাদ দার্শনিকভাবে অপর্যাপ্ত ছিল কারণ এটি সমাজ ও তার পরিবর্তনের সাথে নিজেকে যুক্ত করেনি। মার্কস এবং তাঁর অনুসারীরা এগুলিকে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য বস্তুবাদের সম্প্রসারণ ও রূপান্তর করেছিলেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে প্রথমে কার্যকরী হয়ে, দ্বান্দ্বিক মতবাদ প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রবেশ করেছে। 

বিজ্ঞান সমাজকে প্রভাবিত করে প্রধানত উৎপাদন পদ্ধতির পরিবর্তনের মাধ্যমে এবং সেই সময়ের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শের ওপর এর অনুসন্ধান এবং ধারণাগুলির মাধ্যমে। মার্কসবাদের প্রভাব ছাড়া, সমাজে মানব সম্পর্কের আলোচনা, জাদু ও ধর্মের থেকে উঠে আসতে পারত না। উৎপাদনের প্রতিটি অবস্থায় বিজ্ঞানের যে ভূমিকা ছিল তার আলোচনায় ঢুকেছেন বার্নাল। যে কোনো সময়ে উৎপাদনের প্রযুক্তিগত স্তর সামাজিক সংগঠনের সম্ভাব্য রূপগুলির একটি সীমাবদ্ধতা এনে দেয় – পণ্যের উৎপাদন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে মানুষের মধ্যে সম্পর্কের ভিত্তিতে। একটি নতুন শ্রেণি যখন ক্ষমতার অবস্থানে ওঠে, তখন উৎপাদনে উদ্দীপনা এবং উৎপাদন সম্পর্কে দ্রুত পরিবর্তন দেখা যায়, যা এই শ্রেণির সম্পদ ও ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, এবং বিজ্ঞান তখন বিশেষ গুরুত্ব পায়। আবার, সেই শ্রেণি ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে, স্থিতিশীলতার আগ্রহের ফলে কৌশলগুলি প্রথাগত হয়ে পড়ে এবং বিজ্ঞান অবহেলিত হয়।  

শুরু থেকেই, সংখ্যালঘু উচ্চ শ্রেণি বা প্রতিভাধর ব্যক্তিদের মধ্যে সীমাবদ্ধতা বিজ্ঞানের প্রগতিকে মন্থর করেছে। এই যোগ দেখা গিয়েছিল, নগরসভ্যতার সাথে উদ্ভূত শ্রেণি বিভাজনের আদিকাল থেকেই। বিজ্ঞানকে একটি রহস্য হিসাবে মুষ্টিমেয় কয়েকজনের হাতে সীমাবদ্ধ করে রাখলে, তা শাসকশ্রেনির স্বার্থের সাথেই যুক্ত হয়ে পড়ে এবং জনসাধারণের প্রয়োজনীয়তা এবং ক্ষমতার থেকে উঠে আসা উপলব্ধি এবং উৎসাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, যেমনটি হয়েছে পুঁজিবাদের বিকাশের পরবর্তী পর্যায়ে। বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ফলপ্রসূ সময়গুলি ছিল, যখন শ্রেণির বাধা, অন্তত আংশিকভাবে, ভেঙে দেওয়া হয়েছিল – রেনেসাঁর প্রথম দিকে ইতালিতে, মহান বিপ্লবের ফ্রান্সে, নতুন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলিতে।

দ্বিতীয় অধ্যায়ের আলোচনার বিষয় প্রাচীন বিশ্বে বিজ্ঞান। প্রাচীন সমাজে বিজ্ঞানের উৎস সন্ধানে মূল অসুবিধা ছিল প্রাথমিকভাবে পরিচয়যোগ্য আকারের অভাব। বিজ্ঞানের অভিব্যক্তি ছিল মৌখিক, লিখিত হয়েছে পরে। ফলস্বরূপ, বিজ্ঞানের ধারণা এবং তত্ত্বগুলি খুঁজে নিতে হত বিভিন্ন সময়ের সাংস্কৃতিক জীবনের সাধারণ দিক থেকে এবং জাদু, ধর্ম ও দর্শন থেকে। বার্নাল এই আলোচনা করেছেন তিনটি অধ্যায়ে। প্রথমটি প্যালিওলিথিক বা পুরাতন প্রস্তর যুগ, দ্বিতীয়টি নিওলিথিক বা নব্য প্রস্তর যুগ, এবং শেষেরটি লৌহ যুগ।

প্রথম এবং সবথেকে মৌলিক উপায় যা মানুষকে পশুদের থেকে আলাদা করেছিল, তা হল একটি বস্তুভিত্তিক সংস্কৃতির সাথে ধারাবাহিক সমাজ গঠন। ধীরে ধীরে মানুষ বুঝেছিল একটি সমাজের প্রয়োজনীয়তা। কীভাবে মানুষ আগুনের মুখোমুখি হয়েছিল এবং কেন সে একে নিয়ন্ত্রণ করে জ্বালাতে সাহস করেছিল, তা খুব পরিষ্কার নয়। কিন্তু, মানুষ বুঝেছিল এর ব্যবহারে ঠাণ্ডা রাতে শরীর গরম রাখা যায়। রান্নার প্রচলন এসেছিল পরে। শিকার করা পশুর লোমশ চামড়াও শরীরকে উষ্ণ রাখত। এর থেকে পোশাকের ভাবনা এসেছিল। গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার ছিল মাটির পাত্র তৈরি করা যাতে জল এবং আগুন ধরে রাখা যায়।

প্রকৃতির কার্যকারিতা সম্পর্কে বিশেষ ধারণা না থাকলেও, মানুষ প্রকৃতির মধ্যে কিছু নিয়ম লক্ষ্য করেছিল এবং সেখান থেকে কিছু সুযোগ নেওয়া শিখেছিল। গোষ্ঠীগুলির অস্তিত্ব নির্ভর করত খাদ্য সংগ্রহের উপর – একটি সীমিত এলাকায় শিকারের জন্য পশুর উপলব্ধতা এবং তাদের শিকার করার সক্ষমতার উপর। কৌশলের সীমাবদ্ধতা পূরণ করতে জাদু এবং টোটেম বিকশিত হয়েছিল। 

কৌশলের বিকাশ এবং ব্যবহার করে, মানুষ পরিবেশকে পরিবর্তন করতেও শিখেছিল ক্রমশ। প্রতিটি কৌশল ব্যবহার বা নিয়ন্ত্রণযোগ্য পরিবেশের ক্ষেত্রকে বড় করেছে। বিজ্ঞানের ইতিহাসের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিল শিকারের ক্ষেত্রে যান্ত্রিক উন্নয়ন, যা অনেক বেশি দক্ষ শিকার সম্ভব করেছে এবং নতুন বৈজ্ঞানিক ভাবনার জন্ম দিয়েছে। যন্ত্রপাতি তৈরি এবং ব্যবহারে বলবিদ্যা ও পদার্থবিদ্যার ভিত্তি, আগুনের ব্যবহারে রসায়নের ভিত্তি এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের জ্ঞানে জীববিদ্যার ভিত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সামাজিক জ্ঞান ভাষা এবং শিল্পকলার মধ্যে নিহিত ছিল। দীক্ষা অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সূচনার সাথে টোটেমিজমে পদ্ধতিগত করা হয়েছিল। শিকার এবং খাদ্য সংগ্রহের উপর নির্ভরশীল উপজাতিদের চরিত্রটি ছিল মূলত সামাজিক, শ্রেণি বিভাজন ছাড়াই। সমাজ প্রাথমিক ভাবে ছিল মাতৃতান্ত্রিক। বড় শিকারের বিকাশ, একজন প্রধান খাদ্য-সংগ্রাহক হিসাবে পুরুষের গুরুত্ব বাড়িয়েছে। সম্ভবত, প্রস্তর যুগের শেষের দিকে নারীদের উপর পুরুষের আধিপত্যের ব্যাপারটি এসেছিল।

ক্রমাগত শিকারের কারণে তাদের শিকারস্থল থেকে বৃহৎ প্রাণীরা ক্রমাগত দুষ্প্রাপ্য হতে থাকে। শিকারের অপ্রতুলতা, জলবায়ুর পরিবর্তন, ইত্যাদি কারণে প্যালিওলিথিক সমাজ কার্যত ভেঙে পড়ে, কিন্তু এর শিল্পকলা এবং এমনকি এর সামাজিক সংগঠনগুলিও সংরক্ষিত ছিল, কেবলমাত্র পরবর্তীকালের আরো সমৃদ্ধ কৃষিভিত্তিক সমাজের একটি অংশ হিসাবে।

তৃতীয় অধ্যায়ের আলোচ্য নিওলিথিক যুগের সময়কালে মিশর, মেসোপটেমিয়া, ভারত এবং চীনের প্রাথমিক নদী সভ্যতার। খাদ্য উৎপাদনের বিপ্লব ছিল উৎপাদনশীল অর্থনীতির প্রথম পদক্ষেপ। সম্ভবত, ফসল ফলানো এবং পশুপালন সর্বদাই একসাথে যুক্ত ছিল। নদীর পাড়ের পলিপ্লাবিত এলাকায় কৃষির মাধ্যমেই গড়ে উঠেছিল প্রাচীন সভ্যতার নদী-সংস্কৃতি। প্রথমে প্রাকৃতিক, তারপরে কৃত্রিম সেচের উপর ভিত্তি করে কৃষিব্যবস্থা বিকশিত হয়েছিল। 

কৃষি অনুশীলনের ফলে মানুষ পরিবেশের ওপর কিছুটা নিয়ন্ত্রণ অর্জন করতে সক্ষম হয়। কৃষিকাজে ফলের সাথে কাজের একটা সম্পর্ক কিছুটা যুক্তিবাদী বিজ্ঞানের ভিত্তি হয়ে ওঠে। নিওলিথিক সম্প্রদায়ের প্রধান উদ্বেগ ছিল ফসল নিয়ে। গাছপালা বৃদ্ধি এবং প্রজননের ভাবনা থেকে টোটেমিক আচার অনুষ্ঠানে জোর দেওয়া হয়েছিল। সম্পত্তির উত্থান প্রথমে ছিল সামাজিক। কিন্তু উৎপাদন বৃদ্ধির সাথে পুরোনো বণ্টনব্যবস্থা অপর্যাপ্ত হয়ে উঠছিল। প্রথাগত বিনিময়ের জায়গায় এসেছিল বিনিময়-বাণিজ্য। 

নিওলিথিক যুগের বৈশিষ্ট্যগত অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক একক ছিল গ্রাম। নগরের উদ্ভব ছিল সভ্যতার একটি পরিণতি। প্রতিটি নগরে একজন দেবতা এবং তাঁর অনুচর পুরোহিতরা আধিপত্য বিস্তার করতেন; সুবিধার সর্বাধিক অংশ দখল করতেন। শ্রমের প্রাথমিক বিভাজন ঘটছিল, কারিগরেরা জমি থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছিলেন। হাম্মুরাবির কোডে আমরা সমাজে শ্রেণিবিভাগ দেখতে পাই। বৈষম্যগুলি জোরদার এবং স্থায়ী হয় বাণিজ্যের মাধ্যমে। বেশিরভাগ কারিগরেরা কার্যত দাস ছিল। সম্পত্তিহীন মানুষ মজুরির জন্য তাদের শ্রম বিক্রি করত। কৃষক ও নগরের কারিগরদের এই দাসত্ব, দ্বন্দ্বের সৃষ্টি করে নগর রাজ্যগুলিকে দুর্বল করে; বিদ্রোহের ইতিহাসও আছে। মন্দিরের ক্ষতি বা রক্তপাতের ঘটনা আটকানোর জন্য আইন তৈরি হয়েছিল। রাষ্ট্রের ক্ষমতা, প্রকৃতপক্ষে পুরোহিত এবং বণিকদের উচ্চশ্রেণির সমর্থনের উপর নির্ভরশীল ছিল। 

প্রধান প্রযুক্তিগত অগ্রগতি ছিল ধাতুর আবিষ্কার ও ব্যবহার। কার্যকরী ধাতু হিসাবে পাওয়া যায় ব্রোঞ্জ। কৃষিকাজে উন্নতি এসেছিল। সভ্যতা ছড়িয়ে পড়েছিল, গ্রামবাসীদের ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে, ব্যবসায়ীদের, বিশেষ করে খনিজীবিদের মাধ্যমে, এবং রাজনৈতিক ও সামরিক হস্তক্ষেপের কারণে। বড় পরিমাণে উপকরণের কার্যকরী পরিবহনের ভাবনা থেকে এসেছিল প্রারম্ভিক নৌকা এবং জাহাজ। সমুদ্র ভ্রমণের জন্য দরকার ছিল মজবুত জাহাজ নির্মাণের। সমুদ্রে পথ খুঁজে বার করার প্রয়োজনীয়তা থেকে জ্যোতির্বিদ্যার চাহিদা আসে। চাকার ব্যবহার পরবর্তী সময়ে বলবিদ্যা, শিল্প এবং পরিবহনে উন্নতি আনে। 

পণ্যের হিসাব লিপিবদ্ধ করার প্রয়োজন থেকে মানককরণ এবং তুলাযন্ত্রের সাহায্যে ওজনের পরিমাপ শুরু হয়েছিল; হয়েছিল লেখার উদ্ভব। জ্যামিতির ভিত্তি তৈরি হয় ভবন নির্মাণের কাজ এবং ইটের ব্যবহারে। পিরামিডের আয়তনের গণনা ছিল মিশরীয় গণিতের সর্বোচ্চ উড়ান। মন্দির ও পিরামিডের নির্মাণে লিভার এবং আনততলের বলবিদ্যার ভিত্তি ছিল। ক্যালেন্ডার তৈরি এবং জ্যোতির্বিদ্যার বিকাশ হচ্ছিল। কৃষি সভ্যতার বিকাশের সাথে বছরের হিসাব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জ্যোতির্বিজ্ঞানের সাথে চিকিৎসাও একটি উচ্চ শ্রেণির পেশার মর্যাদা পেয়েছিল। রসায়ন ব্রোঞ্জযুগে বা লৌহযুগের শেষের সময় পর্যন্ত সেভাবে বিজ্ঞানের পদে উন্নীত হয়নি।

যুদ্ধ, সরকার ও রাষ্ট্রের চরিত্রকে পরিবর্তিত করেছিল। রাষ্ট্রপ্রধানের প্রধান কাজ যুদ্ধনেতা হিসাবে সামনে আসে – পুরোহিত থেকে রাজা। অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত অগ্রগতি থেমে গেলেও অস্ত্র নির্মাণ প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বজায় রেখেছিল। ইঞ্জিনিয়ারের পেশা গুরুত্ব পায়। নগর অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতার একটি বড় উৎস ছিল যুদ্ধের সংগঠিত হিংসা। বার্নাল যুদ্ধকে, প্রকৃত অর্থে, সভ্যতার একটি ফসল হিসাবে চিহ্নিত করেছেন। যুদ্ধের জন্য শাসক গোষ্ঠীর একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক স্বার্থ ছিল। শক্তিশালী রাজ্যগুলি সভ্যতার কেন্দ্রগুলিকে ঘিরে থাকা বর্বর উপজাতিদের একটিকে অন্যদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করত, অভিযান চালিয়ে তাদের দাস বানাতো। সভ্য দেশে, উন্নত কৃষি সরঞ্জামের কারণে, ক্রীতদাসের ব্যবহার আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছিল। নবগঠিত শ্রেণিসমাজে শিক্ষা ও বিজ্ঞান যুক্ত হয়ে গিয়েছিল উচ্চশ্রেণির সাথে। 

ধর্মের শক্তিগুলি শুরু থেকেই শ্রেণি শাসনের রক্ষণাবেক্ষণের কাজে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিল। তাদের পতনের কয়েক শতাব্দী আগেই, পশ্চিমের প্রাচীন সভ্যতাগুলি, পরিবর্তনের ক্ষমতা হারিয়ে, ক্রমশ ক্ষয়িষ্ণু হতে থাকে। তা সত্ত্বেও এই সভ্যতায় জ্ঞানের একটি চিত্তাকর্ষক এবং মূল্যবান ভাণ্ডার ছিল, উত্তরসূরিদের কাছে হস্তান্তরের জন্য। যদিও সেই জ্ঞানের অল্প অংশই অঙ্গীভূত হতে পেরেছিল, নতুন সামাজিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর সংস্কৃতিতে। সেই সময়ের ইতিহাস, কবিতা এবং সাহিত্যের বিশাল সঞ্চয়ের অনেকটাই হারিয়ে গিয়েছিল। বাইবেলে যে সামান্য কিছু টিকে আছে, তা দেখায় তারা কোন পর্যায়ে পৌঁছেছিল। সেই সময়ের জীবনের প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় ইলিয়াড এবং ওডিসিতে, যেগুলি নিজেরাই নগরসভ্যতার ধ্বংসের এবং লুণ্ঠনের কাহিনী। 


প্রকাশের তারিখ: ০৫-সেপ্টেম্বর-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

খুবই মনোগ্রাহী আলোচনা... - (সম্পাদিত)
- অঞ্জন মুখার্জী, ০৫-সেপ্টেম্বর-২০২৩


আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বিজ্ঞান ও সমাজের আন্তসম্পর্কের বিষয়ে গভীরে গিয়ে যদি আমাদের অনুশীলন করতে হয়, তবে মার্ক্স ও এঙ্গেলসের পর যার নাম আসবে তিনি নি:সন্দেহে এই মহান বৃটিশ কমিউনিস্ট, সর্বকালের অন্যতম শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানী, জন ডেসমণ্ড বার্নাল। শুধু কেলাসের উপর মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাই তাঁকে নোবেল প্রাইজ এনে দিতে পারত। বার্নাল সম্ভবত একমাত্র বিজ্ঞানী, যার একাধিক ছাত্র ছাত্রী নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেও, ওনাকে বারে বারে বঞ্চিত করা হয়েছে স্রেফ কমিউনিস্ট বলে৷ ওনার দুর্দান্ত সব ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে ছিলেন রোজালিন্ড ফ্রাঙ্কলিন, ডরোথি হজকিন, অ্যারন ক্লুগ, ম্যাক্স পেরুজ। এঁরা অনেকেই নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হয়েছিলেন কেলাস ও আরও বহুবিধ বিষয়ের উপর বার্নালের মৌলিক গবেষণাকে ভিত্তি করে। একবার প্রো: বার্নালের শুধু গবেষণার বিষয়গুলোর উপর তাকানো যাক৷ Science in History র প্রথম খণ্ডে প্রো: বার্নাল সম্বন্ধে শুরুতেই বলা হচ্ছে: "...Professor Bernal's research work has touched upon all aspects of crystallography, notably instrumentation, symmetry groups, and the structure of all kinds of materials. He has examined increasingly complex biological materials and has made fundamental contributions. More recently he has made great syntheses of the fields of origin of life and of the solar system. He directs a laboratory, the interests of which include the structure of industrial products. He has always been concerned with the past, present, future history of science and its social implications. তাহলে মৌলিক বৈজ্ঞানিক গবেষণার আর কোন ক্ষেত্র বাকি থাকল? এই করতে গিয়েও উনি Science in History র মত চার খণ্ডে, প্রস্তর যুগ থেকে হাইড্রোজেন বোম অবধি, বিজ্ঞানের সাথে সমাজের আন্ত:সম্পর্কের গোটা ইতিহাসটা লিখে ফেললেন৷ আমাদের তো রীতিমতো ভিরমি খাবার জোগাড়। প্রসঙ্গত: বার্নালের ছেলে, মার্টিন বার্নালও আরেক দিকপাল৷ তাঁর "Black Athena: AfroAsiatic Roots of Classical Civilization" আরেকটি কালজয়ী গবেষণাধর্মী বই। তাই জে ডি বার্নালের "ইতিহাসে বিজ্ঞান" র উপর "মার্ক্সবাদী পথ" র লেখা ছাপানো এই মুহূর্তে অতি জরুরী। বিশেষ করে যখন বিজ্ঞানে গবেষণারত প্রখ্যাত বিজ্ঞানী, ছাত্ররাও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি ছেড়ে ঈশ্বর, তুকতাক, পূজা অর্চনা, নানা কুসংস্কারের বলি হচ্ছেন। বার্নাল এই সময়ে আমাদের আলোকবর্তিকা হতে পারেন। রানা মিত্র। - (সম্পাদিত)
- Rana Mitra, ০৫-সেপ্টেম্বর-২০২৩


বইটি প্রথম পাঠ করি কমরেড নিরুপম সেনের কাছ থেকে সংগ্রহ করে। পরবর্তীকালে আশিস লাহিড়ীর বঙ্গানুবাদ পড়ার সুযোগ হয়েছিল। বর্তমান প্রবন্ধটিও খুব ভাল হয়েছে। পরের কিস্তির অপেক্ষায় রইলাম। - (সম্পাদিত)
- Srirup Gopal Goswami , ০৫-সেপ্টেম্বর-২০২৩


মূল বইটা পড়তে চাই। বইটার বাংলা অনুবাদ যদি থাকে ত email/ WhatsApp এ জানালে সংগ্রহ করে পড়তে চাই। - (সম্পাদিত)
- JYOTIRMOY KARMAKAR, ০৬-সেপ্টেম্বর-২০২৩


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫