সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
জে ডি বার্নালের ইতিহাসে বিজ্ঞান – একটি আলোচনা (পর্ব ২)
শ্যামাশীষ ঘোষ
বার্নাল গ্রীক বিজ্ঞানের আলোচনা করেছেন চারটি পর্যায়ে – আয়োনিয়ান, এথেনিয়ান, আলেকজান্দ্রিয় বা হেলেনীয় এবং রোমান। আয়োনিয়া গ্রীক বিজ্ঞানের জন্মস্থান – খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। প্রথাগত গ্রীক দার্শনিকদের প্রথম থালেস পৃথিবীর সৃষ্টির ধারণায় সৃষ্টিকর্তার ভূমিকা সরিয়ে দিয়েছিলেন। পরিবর্তনশীলতার দার্শনিক হেরাক্লিটাস বিপরীতের ধারণা এনেছিলেন – দ্বান্দ্বিক দর্শনের প্রথম উচ্চারণ। গণিত, বিজ্ঞান এবং দর্শনের যোগাযোগ পিথাগোরাসের স্কুলের মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল। এদের তত্ত্ব এবং অনুশীলন গ্রীক বিজ্ঞানে এনেছিল চিন্তাপদ্ধতির দুটি ধারা।

চতুর্থ অধ্যায়ে বার্নাল প্রধানত ভুমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের লৌহযুগের আলোচনা করেছেন – গ্রীক এবং রোমানদের ধ্রুপদী সভ্যতার। এই অঞ্চলেই প্রথম বিমূর্ত এবং যুক্তিবাদী বিজ্ঞানের জন্ম, যা থেকে আমাদের সময়ের সর্বজনীন বিজ্ঞান উদ্ভূত হয়েছে। লৌহযুগে বিশেষ কোনো প্রযুক্তিগত অগ্রগতি না হলেও সস্তা এবং সহজে পাওয়া লোহা ব্যবহারের মাধ্যমে এটি ছড়িয়ে পড়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চদশ শতক থেকে বর্বর উপজাতিদের আক্রমণের মুখে প্রাচীন সাম্রাজ্যগুলি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারেনি। এই বর্বররাই আবার বন কেটে, জলাভুমি সাফ করে চাষের সুবিধা বাড়ায়। ইউরোপ একটি নতুন “সোনালী পশ্চিম” হয়ে উঠেছিল – তার গম ক্ষেতের সোনালী আভায়। সমুদ্রপথের ব্যবহারের মাধ্যমে সংস্কৃতির দ্রুত প্রসারণ মানুষের চিন্তাধারা এবং বিজ্ঞানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বাণিজ্য, অনুসন্ধান এবং উপনিবেশ গড়া লাভজনক হয়ে উঠেছিল।
বাজারের জন্য পণ্য উৎপাদন শুরু হয় ক্রীতদাসদের ব্যবহার করে। নগরগুলি ছিল উৎপাদন ও বাণিজ্যের কেন্দ্র। নগরের শ্রেণিগুলির রাজনৈতিক সংগ্রামের মধ্য দিয়ে রাজনীতির একটি ধারা গড়ে উঠছিল। ধাতব মুদ্রার প্রচলন লৌহযুগে চালু হলেও এর ব্যবহার ছিল ব্যতিক্রমী। লেখার পদ্ধতির বিকাশ সাক্ষরতার প্রসার ঘটিয়েছিল, বৌদ্ধিক যোগাযোগের জগতকে উন্মুক্ত করেছিল। বাইবেল, খ্রিস্টধর্মে প্রত্যক্ষভাবে এবং ইসলামে কোরানের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে, প্রায়শই জনপ্রিয় বিপ্লবী আন্দোলনের অনুপ্রেরণা হিসাবে কাজ করেছিল; বিজ্ঞানের পাশাপাশি বিশ্বাস ও নৈতিকতার ক্ষেত্রেও নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব অর্জন করেছিল।
বার্নাল গ্রীক বিজ্ঞানের আলোচনা করেছেন চারটি পর্যায়ে – আয়োনিয়ান, এথেনিয়ান, আলেকজান্দ্রিয় বা হেলেনীয় এবং রোমান। আয়োনিয়া গ্রীক বিজ্ঞানের জন্মস্থান – খ্রিস্টপূর্ব ষষ্ঠ শতাব্দীতে। প্রথাগত গ্রীক দার্শনিকদের প্রথম থালেস পৃথিবীর সৃষ্টির ধারণায় সৃষ্টিকর্তার ভূমিকা সরিয়ে দিয়েছিলেন। পরিবর্তনশীলতার দার্শনিক হেরাক্লিটাস বিপরীতের ধারণা এনেছিলেন – দ্বান্দ্বিক দর্শনের প্রথম উচ্চারণ। গণিত, বিজ্ঞান এবং দর্শনের যোগাযোগ পিথাগোরাসের স্কুলের মাধ্যমে পাওয়া গিয়েছিল। এদের তত্ত্ব এবং অনুশীলন গ্রীক বিজ্ঞানে এনেছিল চিন্তাপদ্ধতির দুটি ধারা। বিমূর্ত বিষয়গুলি পারমেনিডেস গ্রহণ করে রহস্যবাদের সঙ্গে মিশিয়েছিলেন, যা প্লেটোর ভাববাদের ভিত্তি হয়েছিল। বিপরীতদিকে, পিথাগোরাসের সংখ্যাতত্ত্ব, লিউসিপ্পাস এবং ডেমোক্রিটাসের পরমাণু তত্ত্ব বস্তুবাদী বিষয়বস্তু প্রদান করেছিল। গ্রীক চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে প্রবাদপ্রতিম চিকিৎসক হিপ্পোক্রেটস-এর নাম যুক্ত।
দ্বিতীয় পর্যায় ছিল ৪৮০ থেকে ৩৩০ খ্রিস্টপূর্ব পর্যন্ত, আলেকজান্ডার কর্তৃক গ্রীক নগরগুলির অধিকারের আগের বছরগুলি। এ যুগের মহান দার্শনিকেরা – সক্রেটিস, প্লেটো এবং অ্যারিস্টটল – ক্ষয়িষ্ণু এথেন্স সভ্যতার সময়কালীন। তাঁরা প্রথম মুক্ত নগরের বৈপ্লবিক চিন্তাকে পরিবর্তন করার চেষ্টা করেছিলেন প্রতিবিপ্লবের দিকে। অ্যারিস্টটলের চিন্তা জুড়ে ছিল প্রভু এবং দাসের ধারণা, যা তাঁর বস্তু এবং আকারের দ্বৈত ধারণায় প্রকাশিত – বস্তু বুদ্ধিহীন; মন এর উপর আকার চাপিয়ে দেয়। স্বর্গীয় বস্তুর গতিসম্পর্কিত অ্যারিস্টটলের মতবাদ, তাঁর বিশেষ কর্তৃত্বের কারণে, বৈধ পদার্থবিদ্যার সম্ভাবনা অনেকটাই পিছিয়ে দিয়েছিল।
হেলেনীয় পর্যায় শুরু হয়েছিল স্বাধীন নগর রাষ্ট্রগুলির অবক্ষয় এবং একটি নতুন ধরণের ভুমিভিত্তিক সাম্রাজ্যের দখলের মাধ্যমে। আলেকজান্ডারের সাম্রাজ্য গ্রীক বিজ্ঞানকে প্রাচ্যের প্রাচীন সংস্কৃতির উৎসগুলির সাথে সরাসরি যোগাযোগে নিয়ে আসে। লৌহযুগের নতুন অবস্থার ব্যবহারে সবচেয়ে সফল ছিল গ্রীকরা। গ্রীক চিন্তাভাবনা এবং কর্মের অনন্য বৈশিষ্ট ছিল প্রাচীনদের শিক্ষাগত উপাদান গ্রহণ করে, যৌক্তিকতা এবং বাস্তবতার ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি গড়ে তোলা। আলেকজান্দ্রিয়া বিজ্ঞানের জন্য একটি নতুন আবাসে পরিণত হয়েছিল। আলেকজান্দ্রিয়ার মিউজিয়ম ছিল প্রথম রাষ্ট্র-সমর্থিত গবেষণা প্রতিষ্ঠান। এই সময়টি গণিত, বলবিদ্যা এবং জ্যোতির্বিদ্যার দুর্দান্ত বিকাশের, যার সঙ্গে ইউক্লিড, আর্কিমিডিস এবং হিপারকাস যুক্ত ছিলেন। বিজ্ঞানের ইতিহাসে, দর্শনের থেকে স্বতন্ত্র হিসাবে, এই সময়টি ছিল সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, যখন সঠিক বিজ্ঞানের কাঠামোটি একটি সুসংহত সমগ্র হিসাবে গঠিত হয়েছিল। টলেমি যে চেহারায় জ্যোতির্বিদ্যা উপস্থিত করেছিলেন, রেনেসাঁর সময় পর্যন্ত তাই মানদণ্ড হিসাবে ছিল। আর্কিমিডিস ছিলেন গ্রীক গণিত ও বলবিদ্যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং মৌলিক গ্রীক বিজ্ঞানের সর্বশেষ মহান ব্যক্তিত্ব। তিনি সাধারণ যন্ত্রের কার্যপ্রণালীর একটি সম্পূর্ণ এবং পরিমাণগত ব্যাখ্যা, স্থিতিবিজ্ঞানের একটি ভিত্তি, এবং ভাসমান বস্তুর নিয়মগুলি প্রদান করেছিলেন।
চিত্রকলা এবং ভাস্কর্যে, নাটকে এবং বিজ্ঞানে মানুষের বাস্তবসম্মত ও যুক্তিবাদী উপস্থাপনা ছিল গ্রীক সভ্যতার নতুন বৈশিষ্ট। গ্রীক বিজ্ঞান কিন্তু প্রযুক্তিগত বিবেচনা থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল, পর্যবেক্ষণ এবং পরীক্ষা অবহেলিত হয়েছিল। কারিগর বা শ্রমিক, মননশীল চিন্তাবিদদের তুলনায় নিকৃষ্ট সত্ত্বা বলে ভাবা হত। দাসপ্রথার সঙ্গে যুক্ত হয়ে এটি পরবর্তী গ্রীক সমাজে দৃঢ়ভাবে বলবত হয়েছিল। নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের অবমূল্যায়ন হয়েছিল। দর্শন, যা ইতিমধ্যেই বিজ্ঞানের থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল, রাজনৈতিক জীবন থেকেও আলাদা হয়ে অনেকটা নীতিশাস্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
এর পরের সময় ধ্রুপদী বিজ্ঞানের অবমূল্যায়নের। খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় শতকের মধ্যভাগ থেকেই হেলেনীয় সাম্রাজ্যগুলি তাদের নৈরাজ্য এবং রোমের ক্ষমতার চাপে ভেঙে পড়ছিল। রোমের অভ্যন্তরেও দেখা দেয় রাষ্টক্ষমতা দখলের জন্য অভিজাত প্যাট্রিসিয়ান ও সাধারণ জনগণ প্লেবিয়ানদের মধ্যে লড়াই। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে এই গৃহযুদ্ধ থেকে জন্ম নেয় নতুন রোমান সাম্রাজ্য। এই সময়ে গ্রিক সভ্যতার প্রাথমিক উদ্দীপনা প্রায় অন্তর্হিত। সভ্যতার জন্য রোমানদের সম্ভবত সবচেয়ে বড় ইতিবাচক অবদান ছিল আইনের একটি ব্যবস্থা প্রণয়ন।
অর্জিত জ্ঞান ধারাবাহিকভাবে চর্চার অভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং হারিয়ে যায়। মানুষের চিন্তা পুনরায় রহস্যবাদ এবং ধর্মের দিকে মোড় নেয়। দার্শনিক রহস্যবাদকে মেশানো হয়েছিল ধর্মগুলিতে, যার মধ্যে সবচেয়ে সফল ছিল খ্রিস্টধর্ম। ধ্রুপদী সময়ের শেষের দিকের এই অবক্ষয় ছিল ধনিকতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সামাজিক এবং অর্থনৈতিক অবক্ষয়ের ফল। ধ্রুপদী বিজ্ঞানের অনেকটাই নানা গ্রন্থে রয়ে গিয়েছিল, যা পরে আরব এবং রেনেসাঁর মানবতাবাদীরা উদ্ধার করেছিলেন।
পঞ্চম এবং ষষ্ঠ অধ্যায়ের আলোচনা একটি বিস্তৃত সময়কালের, একটি নতুন সামন্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার। ৪৫০ থেকে ১১৫০ খ্রিস্টাব্দ সময়কালটি ছিল ইউরোপে ধ্রুপদী কৌশল এবং বিজ্ঞানের যা অবশিষ্ট ছিল তার উদ্ধারের এবং হেলেনীয় সংস্কৃতি দ্বারা প্রভাবিত সিরিয়া, ইজিপ্ট, পারস্য, ভারত এবং চীনে এর ধারাবাহিক বিকাশের। পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতক শুধু পারস্য এবং সিরিয়ায় নয়, ভারতেও এক মহান সাংস্কৃতিক অগ্রগতি ঘটায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল সেই সময়ের বিজ্ঞানের বিকাশ, বিশেষত গণিত এবং জ্যোতির্বিদ্যায় – আর্যভট্ট, বরাহমিহির এবং ব্রহ্মগুপ্ত। এর ভিত্তি ছিল মূলত হেলেনীয় যার সঙ্গে ব্যাবিলোনিয়া এবং সম্ভবত চীন থেকে কিছু যুক্ত হয়েছিল। একটি নির্ণায়ক নতুন বিকাশ হয়েছিল স্থান নির্ণয় এবং শূন্য সহ সংখ্যাব্যবস্থার। সবকিছুর বিচারে দেখা যায় ষষ্ঠ এবং সপ্তম শতক, অন্ধকার হওয়া দূর, বিশ্বব্যাপী সভ্যতার অগ্রগতির একটি সময়, যেখানে গ্রীক ঐতিহ্য জন্ম দিয়েছিল নতুন সৌন্দর্য এবং চিন্তার। দ্বিতীয় ভাগটি ১১৫০ থেকে ১৪৪০ এই সময়কাল জুড়ে পরিস্কারভাবে ইউরোপের। ইসলামিক ধরণের একটি প্রাণশক্তিপূর্ণ সামন্ত সমাজের বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রভাবের মাধ্যমে এই সময়ের শুরু, যা এগিয়ে দিয়েছিল মধ্যযুগীয় পাণ্ডিত্যের একটি অসাধারণ আন্দোলনে, যা অবশ্য বজায় রাখা যায়নি। এই সময়কালে ক্রমশ অস্থিতিশীল হয়ে ওঠা সামন্ততন্ত্রের শর্তাধীন একটি ধীর কিন্তু ক্রমবর্ধমান হারে কৌশলগত এবং বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি নজরে আসছিল। এই অগ্রগতি নিজে এবং এর অর্থনৈতিক পরিণাম পুঁজিবাদের পরবর্তী সামাজিক চেহারার জন্ম দেবে।
যদিও সামন্ত সামাজিক ব্যবস্থা প্রাক-ধ্রুপদী গ্রামীণ অর্থনীতির মতই ছিল, এটি ছিল উচ্চতর কৌশলের স্তরে ফেরা। কৃষি এবং ব্যবহারিক শিল্পে উন্নতিগুলি মানুষের কাজকে যান্ত্রিকভাবে প্রতিস্থাপিত করার দিকে যাচ্ছিল – লোহা, উন্নততর লাঙ্গল, লাগাম, তাঁত এবং চাকির মত শ্রমলাঘবকারী সরঞ্জামের ব্যাপক ব্যবহারের মাধ্যমে। নগরগুলি কারিগরদের গিল্ডের তৈরি নতুন পণ্য বিনিময় করত সামন্ত অর্থনীতির উদ্বৃত্তের মাধ্যমে। নগরের প্রতিষ্ঠানগুলি থেকেই এসেছিল বার্জেস বা বুর্জোয়া শ্রেণি। দশম শতাব্দী থেকেই ইউরোপের অন্তর্নিহিত অর্থনৈতিক সুবিধাগুলি সামনে আসে; প্রধানত কৃষিনির্ভর। পঞ্চম থেকে সপ্তদশ শতকের মধ্যেকার পুরো সময়টাই সামন্ত অর্থনীতির, তবে ইউরোপের একাদশ থেকে চতুর্দশ শতকের সময়কালেই সামন্ত ব্যবস্থাকে, এর পুরো রাজনৈতিক এবং ধর্মীয় শ্রেণিবিন্যাস এবং শিল্প ও জ্ঞান সহ পূর্ণ বিকশিত রূপে দেখা যায়।
সামন্ত উৎপাদনের শর্তগুলি ব্যবহারিক বিজ্ঞানের চাহিদা কমিয়ে দেয়। বৌদ্ধিক প্রচেষ্টা প্রবাহিত হয় সংগঠিত ধর্মীয় বিশ্বাসের দিকে। তৃতীয় এবং সপ্তম শতাব্দীর মধ্যে খ্রিস্টধর্ম, ইসলাম এবং চীন ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধধর্ম দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ভারতে এই সময়েই হিন্দুধর্ম বৌদ্ধধর্মকে প্রতিস্থাপিত করে। ইসলামিক আক্রমণ এবং হিন্দুধর্মের জমাটবদ্ধ জাত কাঠামো ভারতে অগ্রগতির সম্ভাবনা বিনষ্ট করেছিল।
মধ্যযুগের প্রথম দুই শতকে, যে সময়ে রোমান শাসন সবচেয়ে বেশি নিষ্পেষণ করেছিল সাধারণ মানুষ এবং দাসেদের, খ্রিস্টধর্ম নগরগুলির নিপীড়িত নিম্নবর্গের মানুষের আকাঙ্ক্ষার প্রতিনিধি হিসাবে হাজির হয়েছিল। খ্রিস্টধর্ম অবশ্য বেশিদিন নিম্নবর্গের মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। দর্শনকে ধর্মের সাথে মেলানোর চেষ্টা একটি বিতর্কের জন্ম দেয়। পঞ্চম শতাব্দীতে ধর্ম এবং দর্শনের মধ্যে একটি ঐক্য সম্পন্ন করেছিলেন সেন্ট অগাস্টিন, শাস্ত্রীয় ঐতিহ্য এবং প্লেটোবাদের মধ্যে একটি সমঝোতা, একটি নিয়তির ভাবনা এনে, যা খ্রিস্টধর্ম, বিশেষত নৈতিকতাবাদকে, চিরকালের জন্য আবদ্ধ করে ফেলেছিল।
ভাষা, ধর্ম এবং সরকারের যে প্রাচীরগুলি সপ্তম শতাব্দী পর্যন্ত প্রতিটি সংস্কৃতিকে তার নিজের অঞ্চলে আবদ্ধ করে রেখেছিল, তা ভেসে গিয়েছিল প্রাচীন সভ্যতার পুরো এলাকা জুড়ে – ইসলামের আবির্ভাবে। আলেকজান্দ্রিয়া, দামাস্কাসের মত পুরাতন নগরগুলির সাথে কায়রো, বাগদাদের মত নগরগুলিতেও তা ছড়িয়েছিল। ইসলাম হয়ে উঠেছিল এশিয়া এবং ইউরোপের জ্ঞানের মিলনস্থান। গ্রীক দর্শন ও বিজ্ঞানের প্রধান বইগুলির অনুবাদ শুরু হয়। একটি অনুবাদের দপ্তর প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল – দার এল হিকমা। পারস্য, ভারত এবং চীনের অভিজ্ঞতার শিক্ষা নিয়ে তাঁরা গ্রীক গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা এবং চিকিৎসা বিজ্ঞানের সংকীর্ণ ভিত্তিকে প্রসারিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বীজগণিত এবং ত্রিকোণমিতির কৌশল ব্যবহার শুরু হয়, আলোকবিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপিত হয়। রসায়নে বা অ্যালকেমীতে নতুন পরীক্ষা যোগ হয়েছিল। বিজ্ঞানের ঐক্য আরো নিশ্চিত হয়েছিল বিশ্বকোষ তৈরির ঐতিহ্য থেকে। তবে শেষ ধ্রুপদী যুগের বিজ্ঞানকে উন্নত করার বা বৈপ্লবিক করে তোলার এঁদের কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না।
ইসলামিক এবং খ্রিস্টান সময়ের বিজ্ঞানের গৌরব এবং সীমাবদ্ধতা এসেছিল একই শিকড় থেকে, সামন্ততন্ত্রের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ভিত্তি থেকে। ইসলাম এখনও বেঁচে আছে ধর্ম এবং সভ্যতা হিসাবে। অর্থনৈতিক অগ্রগতির উদ্দীপনা হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে প্রাচ্যেও বৌদ্ধিক উদ্দীপনা চলে যায়। চার্চ সংগঠন হিসাবে দুর্বল হলেও, বৌদ্ধিক এবং সামাজিক চিন্তায় এমন ছাপ ফেলেছিল যে পরবর্তী কয়েক শতকের রাজনৈতিক এবং বৈজ্ঞানিক বিতর্ক সংঘটিত হয়েছিল ধর্মের পরিপ্রেক্ষিতেই। সেই সময়ের যে সীমাবদ্ধ চাহিদা ছিল বিজ্ঞানের কাছে, তার থেকে বেশি কিছু বিজ্ঞানের কাছে থেকে আশা করা অবশ্য অন্যায় হবে। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের একটি কাজ হয়ে উঠেছিল বিশ্বের একটি স্বর্গীয় শাসনের যৌক্তিকতা দেখানো। অল্প যাঁরা অন্যভাবে ভাবতেন, হয় ধর্মদ্রোহিতার বিচারের মুখে পড়তেন বা উপেক্ষিত হতেন।
মধ্যযুগের বিশ্বচিত্রের আলোচনা এই কারণেই জরুরী যে আধুনিক বিজ্ঞান উদ্ভূত হয়েছিল একে অতিক্রম করার চেষ্টা থেকেই এবং এই লড়াইয়ের অনেক ছাপ রয়ে গেছে এর সর্বাঙ্গে। গ্রীকো-আরবিক-মধ্যযুগীয় ব্যবস্থা ছিল একটি সম্পূর্ণতার এবং ক্রমোচ্চ শ্রেনিবিভাগের। এটি পরিণত হয়েছিল একটি অনমনীয়, ধর্মীয়-ভৌত বিশ্বের তত্ত্বে – পৃথিবী একটি অন্তর্বর্তীকালীন বিশ্ব, যেখানে মানুষ জীবন কাটায় এবং এর পরিনামে হয় মোক্ষলাভ করে নয়তো অভিশপ্ত হয়। সমাজের স্তরবিভাগ বিশ্বের স্তরবিন্যাসেরই একটি অনুকরণ ছিল – স্বর্গীয় শৃঙ্খলা, সামাজিক শৃঙ্খলা এবং মানুষের দেহের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা। এই বিশ্বচিত্রের একটি অংশে আঘাতকে দেখা হত সামাজিক, ধার্মিক এবং বিশ্বের পুরো ব্যবস্থার উপর একটি আক্রমণ হিসাবে। সেইহেতু চার্চ এবং রাষ্ট্রের পুরো ক্ষমতা দিয়ে একে আটকানোর প্রয়োজন ছিল।
সামন্ত ব্যবস্থা প্রযুক্তিগত এবং সামাজিক দিক থেকে ধ্রুপদী ধনিকতন্ত্রের তুলনায় বেশি উন্নত ছিল। কিন্তু সামন্ত অর্থনীতি বিকশিত হতে পারত কেবলমাত্র জমিচাষের বৃদ্ধির মাধ্যমেই। ত্রয়োদশ শতকের শেষের দিকে এই প্রসারণ তার সীমা অতিক্রম করে গিয়েছিল, যা এক গভীর অর্থনৈতিক সংকটের জন্ম দেয়, যা থেকে সামন্তবাদ আর কখনোই বেরিয়ে আসতে পারেনি। ইতিমধ্যেই সামন্ত ব্যবস্থার মধ্যেই অন্য অর্থনৈতিক রূপ জন্ম নিচ্ছিল – বাণিজ্য এবং শহরের উৎপাদনের অর্থনীতি।
মধ্যযুগীয় পরিবর্তনহীন চিন্তাব্যবস্থাকে পরিবর্তনের দিকে চলতে বাধ্য করেছিল মধ্যযুগীয় অর্থনীতি – বাণিজ্য, উন্নত পরিবহণ এবং উৎপাদনের পদ্ধতি অবিরত একটি পণ্য এবং মুদ্রা অর্থনীতির দিকে চালিত করছিল। প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত পরিবর্তনগুলি ছিল ভবিষ্যতের বিজ্ঞানভিত্তিক সভ্যতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান। তাৎপর্যপূর্ণভাবে প্রধান উদ্ভাবনগুলি যেমন, ঘোড়ার লাগাম, ঘড়ি, কম্পাস, জাহাজের হাল, বারুদ, কাগজ, এবং মুদ্রণ – প্রধানত চীন থেকেই এসেছিল।
নতুন উদ্ভাবনগুলি প্রযুক্তিগত বিপ্লবে একটি গতি সঞ্চার করে, যা বাণিজ্য এবং উৎপাদনহারের বৃদ্ধি ঘটায়। গ্রামে কৃষি উৎপাদনে উন্নত উপায়ের ব্যবহারের ফলে বিনিময়ের জন্য আরো উদ্বৃত্ত সৃষ্টি হয়। উন্নত পরিবহণ ব্যবস্থা পরোক্ষে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি করে। বাণিজ্য, বণিকদের গুরুত্ব বৃদ্ধি করে, এবং সেইসাথে নগরে ও গ্রামে হস্তশিল্প বাড়তে শুরু করে। পুরো ইউরোপ জুড়ে, বড় মাপের বাজার সৃষ্টি হয়; পণ্যের উৎপাদনে উৎসাহ সৃষ্টি করে। উৎপাদনগুলি যদিও ছিল প্রধানত গ্রামের কৃষকের আংশিক সময়ের উৎপাদন, এর বাণিজ্যে প্রাধান্য ছিল নগরের বণিকদের। এটি বিজ্ঞানের পুনরুজ্জীবনের জন্য বস্তুগত ভিত্তি প্রদান করেছিল। মঞ্চ প্রস্তুত ছিল রেনেসাঁর প্রস্ফুটিত হওয়ার জন্য। চতুর্দশ শতকের শেষে সামন্ত ব্যবস্থার ভেঙে পড়া কিন্তু কোনো সামাজিক অবক্ষয়ের সাক্ষ্য ছিল না, কারণ অর্থনৈতিক এবং প্রযুক্তিগতভাবে অনেক জায়গাতেই স্পষ্ট অগ্রগতির লক্ষণ ছিল। একটি পুরনো সমাজের যখন মৃত্যু ঘটছিল, একটি নতুন তার জায়গা নিচ্ছিল, যেটি মধ্যযুগের তুলনায় ইউরোপের প্রাকৃতিক সম্পদের এবং মানুষের শ্রমের সুবিধার বৃহত্তর ব্যবহারে সক্ষম ছিল।
প্রকাশের তারিখ: ১২-সেপ্টেম্বর-২০২৩
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
