Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

জে ডি বার্নালের ইতিহাসে বিজ্ঞান – একটি আলোচনা (পর্ব ৩)

শ্যামাশীষ ঘোষ
ইউরোপীয় পুঁজিবাদী উদ্যোগের জন্য সমগ্র বিশ্বকে উন্মুক্ত করা ছিল জ্যোতির্বিদ্যা এবং ভৌগলিক বিজ্ঞানের প্রথম সচেতন প্রয়োগের ফল। জাহাজ নির্মাণ এবং নৌচলাচলের জন্য কম্পাস, মানচিত্র এবং যন্ত্র নির্মাণ এক নতুন প্রশিক্ষিত কারিগর শ্রেণির জন্ম দিয়েছিল। এশিয়ার পুরনো এবং ধনী দুটি সভ্যতার এবং আমেরিকার নতুন বিশ্বের যুগল আবিষ্কার, মানুষকে উৎসাহিত করেছিল যে তাঁরা নতুন কিছু অর্জন করতে সক্ষম, যা প্রাচীনদের চিন্তার বাইরে ছিল।
JD Bernal's History of Science – A Discussion (Part 3)

মধ্যযুগের শেষের দিকেই বাণিজ্য ও শিল্পের বিকাশ, সামন্তবাদী অর্থনীতির সাথে বেমানান হয়ে উঠেছিল। পনেরো শতকের মধ্যে বুর্জোয়ারা যথেষ্ট শক্তিশালী হয়ে উঠে সামন্ত অর্থনীতির রূপান্তর শুরু করে। এটি ইতালিতে ত্রয়োদশ শতকেই শুরু হয়েছিল, তবে ব্রিটেন এবং হল্যান্ডের মত সবচেয়ে প্রগতিশীল দেশগুলিতে বুর্জোয়ারা তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে সপ্তদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে। পুঁজিবাদী অর্থনীতি ব্যবস্থার বিজয় অবশ্য তীব্র রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং বৌদ্ধিক সংগ্রামের পরেই সম্ভব হয়েছিল। পুঁজিবাদের উত্থানের শর্তই পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান সম্ভব এবং প্রয়োজনীয় করে তুলেছিল। বার্নালের মতে, পুঁজিবাদ সমাজের অর্থনৈতিক বিবর্তনের কেবল একটি অস্থায়ী পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে বিজ্ঞান মানবতার একটি স্থায়ী অর্জন। অর্থনৈতিক বিপ্লবের এই পর্যায়ের প্রধান উদ্দীপনা প্রদানকারী এবং প্রধান সুবিধাভোগী ছিল হল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের বণিকরা। বিদেশী বাণিজ্য থেকে লাভের ফলে নগদ পুঁজির প্রথম সঞ্চয়, কৃষিতে এবং উৎপাদনশীল উদ্যোগে বিনিয়োগ করার মুলধন হয়ে উঠেছিল।

বার্নাল সপ্তম অধ্যায়ে, এই সময়কালটির আলোচনা তিনটি পর্যায়ে করেছেন। প্রথম পর্যায়ের অন্তর্গত রেনেসাঁ (১৪৪০-১৫৪০), বড়ভাবে নৌচলাচল এবং সংস্কার, ইতালিতে রাজনৈতিক স্বাধীনতার অবসান এবং প্রথম মহাশক্তি হিসাবে স্পেনের উত্থানের সময়। দ্বিতীয় পর্যায়টি ধর্মযুদ্ধের (১৫৪০-১৬৫০)। ইউরোপীয় বাণিজ্য এবং জলদস্যুতার জন্য উন্মুক্ত হয়ে, আমেরিকা এবং প্রাচ্য, ইউরোপের অর্থনীতিকে নাড়া দেয়। এটি ছিল ফ্রান্স এবং জার্মানিতে ধর্মের মীমাংসাহীন যুদ্ধের যুগ। আরো গুরুত্বপূর্ণ ছিল এই সময়কালের শুরুতে ডাচ প্রজাতন্ত্র এবং শেষে ব্রিটিশ বুর্জোয়া কমনওয়েলথ প্রতিষ্ঠা। পুনরুদ্ধারের তৃতীয় পর্যায় (১৬৫০-১৬৯০) ছিল রাজনৈতিক সমঝোতার। সরকার রাজতান্ত্রিক হলেও, বড় বুর্জোয়ারা অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর সমস্ত দেশে ক্ষমতার রাশ ধরে ছিল। ব্রিটেনে এই পর্যায়টি সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সূচনা এবং দ্রুত বাণিজ্যিক এবং শিল্প বিকাশের সূচনা করে। সামন্ত থেকে পুঁজিবাদী অর্থনীতিতে রূপান্তরের একক প্রক্রিয়ার এগুলি ছিল তিনটি পর্যায়।

বিজ্ঞানের অনুরূপ উন্নয়নগুলি ছিল সমগ্র বিশ্বচিত্রের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ। প্রথম পর্যায়ে এটি ছিল কোপার্নিকাস দ্বারা অ্যারিস্টটলের বা টলেমির পৃথিবীকেন্দ্রিক মহাজগতের তত্ত্বের প্রত্যাখ্যান। দ্বিতীয় পর্বে প্রবল বিরোধিতার বিরুদ্ধে চ্যালেঞ্জটি আরো শক্তিশালী হয়েছিল কেপলার এবং গ্যালিলিও দ্বারা এবং হার্ভে দ্বারা মানবদেহে এর প্রসারণ হয়। তৃতীয় পর্যায়টি নতুন বিজ্ঞানের বিজয়, নতুন ক্ষেত্রগুলিতে ছড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে এর দ্রুত বৃদ্ধি এবং সমাজে বিজ্ঞানের প্রথম সংগঠনকে চিহ্নিত করে। এটি একটি নতুন গাণিতিক-যান্ত্রিক দর্শনের বয়েল, হুক এবং হাইজেনসের সময়। অনেক হাত এবং মনের কাজ অবশেষে নিউটনের Mathematical Principles of Natural Philosophy –এর প্রণয়নে সমাপ্ত হয়েছিল, একটি ভিত্তি যার উপর দাঁড়িয়ে অনুভব করা হয়েছিল যে বাকি বিজ্ঞান আত্মবিশ্বাসের সাথে তৈরি করা যেতে পারে। রাজনৈতিক সমঝোতার মত বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে সমঝোতার চিহ্নও দেখা গিয়েছিল।

এই যুগের নতুন সংস্কৃতি অর্থনীতিতে পুঁজিবাদী, শিল্প ও সাহিত্যে ধ্রুপদী এবং প্রকৃতির প্রতি তার দৃষ্টিভঙ্গিতে বৈজ্ঞানিক। কারিগরদের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছিল। রেনেসাঁর আগ্রহের পরিধি দেখা যায় মহান প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী এবং শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চির কাজে। রেনেসাঁ প্রযুক্তির সর্বাপেক্ষা অগ্রগতি দেখা গিয়েছিল খনিবিদ্যা, ধাতুবিদ্যা এবং রসায়নের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কযুক্ত ক্ষেত্রগুলিতে। লোহা গলানোর জন্য কয়লার প্রয়োজন হয় অধিক পরিমাণে। বড় আকারের খনি খনন শুরু হতেই পাম্পিং এবং তোলার যন্ত্রপাতি জরুরী হয়ে উঠেছিল। শক্তি সঞ্চালন এবং পাম্পের কাজে অভিজ্ঞতা অর্জন ছিল যান্ত্রিক এবং হাইড্রলিক নীতিগুলির প্রতি আগ্রহের সূচনাবিন্দু, বৈজ্ঞানিক এবং শিল্প বিপ্লবে যেগুলির অসাধারণ প্রভাব ছিল। বড় রাসায়নিক বিকাশ হয়েছিল পাতনশিল্পে।

সপ্তদশ শতকের শেষার্ধে বিজ্ঞানীরা সেই সময়ের প্রযুক্তিগত সমস্যাগুলির উপর মনোযোগ দিয়েছিলেন, যা ছিল পাম্পিং এবং হাইড্রলিকস, বড় কামান এবং নৌবিদ্যা। আরো গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহারিক ফলাফল ছিল পাম্পের অধ্যয়ন থেকে, যা প্রথমে ভ্যাকুয়াম আবিষ্কার, পরে গ্যাসের সূত্রের দিকে নিয়ে যায়, যেখান থেকে বাষ্প-ইঞ্জিনের উদ্ভব হয়েছিল। বিজ্ঞানী হিসাবে উল্লেখযোগ্য ছিলেন রবার্ট বয়েল এবং রবার্ট হুক। হুক স্থিতিস্থাপকতা অধ্যয়ন করেন এবং আবিষ্কার করেন হুকের সূত্র – সম্প্রসারণ বলপ্রয়োগের সমানুপাতিক। বয়েল সাধারণ বলবিজ্ঞানের বাইরে গ্যাসের চাপ এবং আয়তনের প্রথম বৈজ্ঞানিক সূত্র আবিষ্কার করলেন। বয়েল দেখিয়েছিলেন, ভ্যাকুয়ামে জীবন এবং জ্বলন সম্ভব নয়। এতদিন পর্যন্ত ভ্যাকুয়াম ছিল একটি দার্শনিক প্রশ্ন। গ্যালিলিওর ছাত্র টরিসেলি বায়ুর চাপ মাপার যন্ত্র ব্যারোমিটার আবিষ্কার করেন। টরিসেলির শূন্যস্থান বা ভ্যাকুয়াম ছিল অ্যারিস্টটলের বলবিজ্ঞানের ওপর একটি জোরদার আঘাত। অটো ভন গেরিক বায়ুচাপের শক্তির প্রদর্শন করে দেখিয়ে দিয়েছিলেন বায়ু একটি সত্যিকারের শক্তিশালী বল, যাকে ঠিকভাবে ব্যবহার করে অনেক কাজে লাগানো যেতে পারে। 

আলোকবিদ্যা বিকশিত হয়েছিল প্রতিসরণের প্রকৃতি বোঝার চেষ্টা থেকে। প্রতিসরণের সূত্র প্রথম নির্ণয় করেন হল্যান্ডের স্নেল। স্নেলের সূত্র থেকে টেলিস্কোপ বানানো সম্ভব হয়েছিল। পরীক্ষামূলক কৌশল এবং যুক্তির এক অসাধারণ সংযোগে নিউটন দেখিয়েছিলেন প্রিজমের রঙ বা রঙধনু, সাদা আলোরই অন্তর্নিহিত উপাদান। নিউটন আলোর কণিকা তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন। নিউটনের অনেক আগে, যদিও, হাইজেনস আলোর তরঙ্গ তত্ত্ব প্রদান করেছিলেন, নিউটনের উচ্চতর কর্তৃত্বের কারণে তাঁর মতই প্রতিষ্ঠিত ছিল। মাইক্রোস্কোপ পর্যবেক্ষকদের কাছে অতি ক্ষুদ্র জিনিসের জগত খুলে দিয়েছিল। পোকামাকড়, ছোট্ট উদ্ভিদ, জলে থাকা ছোট জীবগুলি, এমনকি অতিক্ষুদ্র ব্যাকটেরিয়া এবং প্রজননের নীতি বহন করা স্পার্মাটোজোয়া, সবকিছু পর্যবেক্ষণ, অনুমান এবং বিতর্কের বিষয় হয়ে ওঠে। 

ইউরোপীয় পুঁজিবাদী উদ্যোগের জন্য সমগ্র বিশ্বকে উন্মুক্ত করা ছিল জ্যোতির্বিদ্যা এবং ভৌগলিক বিজ্ঞানের প্রথম সচেতন প্রয়োগের ফল। জাহাজ নির্মাণ এবং নৌচলাচলের জন্য কম্পাস, মানচিত্র এবং যন্ত্র নির্মাণ এক নতুন প্রশিক্ষিত কারিগর শ্রেণির জন্ম দিয়েছিল। এশিয়ার পুরনো এবং ধনী দুটি সভ্যতার এবং আমেরিকার নতুন বিশ্বের যুগল আবিষ্কার, মানুষকে উৎসাহিত করেছিল যে তাঁরা নতুন কিছু অর্জন করতে সক্ষম, যা প্রাচীনদের চিন্তার বাইরে ছিল।

পাডুয়ায় পদার্থবিদ্যা এবং সামরিক প্রকৌশলের অধ্যাপক গ্যালিলিও নিজেই একটি টেলিস্কোপ তৈরি করে আকাশের পর্যবেক্ষণ শুরু করেন। তাঁর পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট ছিল পুরো অ্যারিস্টটলীয় বিশ্বছবিকে ভেঙে ফেলার জন্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ ছিল বৃহস্পতির চারপাশে তিনটি চাঁদের প্রদক্ষিণ করা, কোপার্নিকান ব্যবস্থার একটি ছোট মডেল। তিনি এই নতুন পর্যবেক্ষণের বিপ্লবী চরিত্রটি অনুভব করেছিলেন। এর অর্থ ছিল মুক্ত গতিতে বস্তুর একটি গুরুতর অধ্যয়ন। গ্যালিলিও সফল হয়েছিলেন, বস্তুর গতির একটি গাণিতিক বর্ণনা প্রণয়ন করতে। কিন্তু বিশ্বচিত্রের দুই প্রধান ব্যবস্থা – টলেমিক স্থিতির এবং কোপার্নিকাসের গতির – সম্পর্কিত তাঁর মতবাদে নিহিত ছিল চার্চের সঙ্গে তাঁর সংঘাতের অব্যবহিত কারণ। Dialogues ছিল নতুন বিজ্ঞানের প্রথম মহান ইসতেহার। গ্যালিলিওকে তাঁর মতবাদ প্রত্যাহার করতে বাধ্য করা হয়েছিল এবং গৃহবন্দী করা হয়েছিল। বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের প্রয়োজন ছিল নতুন বিজ্ঞানের প্রস্তাবিত সম্ভাবনাগুলি কেবল বিদ্বানদের কাছেই নয়, বরং, নতুন শ্রেণির উদ্যোক্তাদের কাছে পৌঁছে দেওয়া, যাঁরা তাঁদের নিজস্ব রাজনৈতিক বিপ্লব ঘটাচ্ছিলেন – বণিক, নেভিগেটর, নির্মাতা, প্রবক্তারা এবং প্রাথমিক পুঁজিপতিরা। গ্যালিলিও এটি শুরু করেছিলেন। 

বিজ্ঞানের এই সময়কালের মধ্যে রয়েছে নতুন পর্যবেক্ষণমূলক, পরীক্ষামূলক পদ্ধতির প্রথম মহান বিজয়। সপ্তদশ শতকের বিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় আগ্রহ এবং সর্বোত্তম বিজয় ছিল বলবিজ্ঞানের একটি সাধারণ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ করা, পৃথিবীতে পর্যবেক্ষণ করা বস্তুর ব্যবহারের ভিত্তিতে স্বর্গীয় বস্তুর গতি ব্যাখ্যা করা। এখানে আধুনিক মানুষেরা কার্যত প্রাচীন গ্রীকদের সাথে চিরকালের মত সব হিসাবের নিষ্পত্তি করেছিলেন, নিউটনের Principia–এ বলবিজ্ঞানের পরিষ্কার একীকরণে। এখানেই তিনি সামনে এনেছিলেন সার্বজনীন মহাকর্ষ। 

নিউটন ভৌত নীতিগুলিকে, পর্যবেক্ষণের দ্বারা সমর্থনযোগ্য, পরিমাণগত গননাযোগ্য ফলাফলের জন্য গাণিতিক পদ্ধতি খুঁজে বার করেন – ইনফাইনাইটেসিম্যাল ক্যালকুলাস। একে আমরা যে আকারে দেখি তা প্রদান করেন লিবনিজ। এর ব্যবহারে যে কোনো মুহূর্তে একটি বস্তুর অবস্থান নির্ণয় করা সম্ভব। Principia –য় নিউটনের দুটি কাজ ছিল পূর্ণ করার: প্রথমত আগেকার সমস্ত দার্শনিক ধারণা ভেঙে ফেলা; এবং দ্বিতীয়ত তাঁর নিজের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠিত করা, যা শুধু নতুনই নয়, এই ঘটনার ব্যাখ্যার জন্য সবচেয়ে নির্ভুল উপায়। এর প্রমাণ দেন, তাঁর বন্ধু হ্যালি, তাঁর বিখ্যাত ধুমকেতুতে, যার ফেরার পূর্বাভাষ তিনি সাফল্যের সঙ্গে করেছিলেন নিউটনের তত্ত্বের ভিত্তিতে। নিউটন অবশ্য এই ব্যবস্থার চালনার জন্য দৈবিক হস্তক্ষেপের একটি ফাঁক ছেড়ে রেখেছিলেন। এই সময়েই আবার মানুষের দেহ সম্পর্কে উইলিয়াম হার্ভে শরীরে রক্তের গতিবিধির যান্ত্রিক ব্যাখ্যা প্রদান করেছিলেন। নিউটনের সাফল্য একইসাথে কিছু অসুবিধার সৃষ্টিও করেছিল। যে সুর তিনি বিজ্ঞানের জন্য বেঁধে দিয়েছিলেন তা এতটাই মান্যতা পেয়েছিল যে, এর গুরুতর সীমাবদ্ধতাগুলি আইনস্টাইনের সময়ের আগে বোঝা যায় নি। 

দর্শনের জগতে নতুন প্রাকৃতিক দর্শন আগ্রহ ও আলোচনার কেন্দ্রে আসে। বেকন নতুন আন্দোলনের মূলত ব্যবহারিক দিক, শিল্পকলার উন্নতিতে এর প্রয়োগ, চারিপাশের বিশ্বের আরো সাধারণ জ্ঞানের উপলব্ধি আনতে এর উপযোগিতার উপর জোর দিয়েছিলেন। অন্যদিকে, দেকার্তেকে ফ্রান্সের সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গেঁড়ে থাকা একটি মধ্যযুগীয় চিন্তাধারার বিরুদ্ধে লড়াই করতে হয়েছিল। উভয় দার্শনিকের চিন্তাভাবনা অবশ্য মধ্যযুগীয় ধারণাগুলির সাথে যুক্ত ছিল, যদিও প্রতিটি ভিন্নভাবে। দেকার্তের প্রভাব ছিল বিজ্ঞানীদের ধর্মীয় হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত করে, ধর্মীয় বা সামাজিক এলাকায় প্রবেশ করবেন না এই শর্তে, তাঁদের কাজ চালিয়ে যেতে সক্ষম করা। সেটি ছিল একইসাথে এর আকর্ষণ এবং এর বিপদ। বেকন ভেবেছিলেন যে পদ্ধতিগত, সাধারণ অভিজ্ঞতা, প্রাচীনদের ক্ষতিকারক ধারণাগুলি থেকে মুক্ত করাই, জ্ঞানের জন্য যথেষ্ট হবে।

সফল নৌবিদ্যা ছিল জাতীয়, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সাফল্যের চাবিকাঠি। এই শতকগুলির মহান রূপান্তরগুলি সম্পদের পরিমাণ বৃদ্ধি করে একে পুঁজিতে পরিণত করে, এবং এর অসীম বৃদ্ধির রাস্তা খুলে দেয়। ধনতন্ত্রের অধীনে এর প্রথম পর্যায়ে পুঁজির প্রণোদনা কৌশলগত অগ্রগতির মূল্য বাড়িয়েছিল। পঞ্চদশ, ষোড়শ এবং সপ্তদশ শতকে নতুন বিজ্ঞানের জন্ম ধনতন্ত্রের পথ ঘনিষ্ঠভাবে অনুসরণ করেছে। 

অধ্যয়নের নানা ক্ষেত্রের বিভিন্নতা সত্ত্বেও, সপ্তদশ শতকের বিজ্ঞানের একটি অন্তর্নিহিত ঐক্য ছিল যার ভিত্তি ত্রিমাত্রিক: ব্যক্তির, ধারণার এবং প্রয়োগের। প্রথমত বিজ্ঞানীরা তখনো পর্যন্ত জানা বিজ্ঞানের সকল ক্ষেত্র জুড়ে কাজ করতে এবং মৌলিক কাজের জন্ম দিতে পারতেন। যে কারণে, তাঁরা বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে একটি ঐক্যমূলক চিত্র দেখতে সক্ষম ছিলেন, যা পরবর্তীকালে আর সম্ভব হয়নি।      

দ্বিতীয়ত, তখন পথপ্রদর্শক ধারণা এবং কাজের পদ্ধতি ছিল প্রধানত গাণিতিক এবং যে গণিতের ভিত্তি ছিল আরবিক, হিন্দু এবং সম্ভবত চৈনিক অবদান সহ সরাসরি গ্রীকদের থেকে আহরিত। অবশ্য, গণিতের সঙ্গে এই তন্ময়তা সপ্তদশ শতকের বিজ্ঞানে একটি সীমাবদ্ধতা আরোপ করেছিল।        

তৃতীয়টি ছিল প্রয়োগের ক্ষেত্রে, সেই সময়ের প্রযুক্তিগত সমস্যা নিয়ে বিজ্ঞানীদের উদ্বেগ। চতুর্দশ শতক বা আগের তুলনায় কৌশলের বিরাট অগ্রগতি সম্ভব হয়েছিল ঐতিহ্যের সঙ্গে বিচ্ছেদের ফলে। আবার, ঐতিহ্যের সঙ্গে বিচ্ছেদের কারণে, সেগুলি নতুন সমস্যার জন্ম দিয়েছিল, যার সমাধানের প্রচেষ্টা থেকে আধুনিক বিজ্ঞান সৃষ্টি হয়েছিল। 

এর বিকাশের প্রথম পর্যায়ে পরীক্ষামূলক বিজ্ঞান ছিল সমালোচনামূলক এবং পুরানো ঐতিহ্যগত ধারণাগুলি ভেঙে ফেলার; এর শেষ পর্যায়ে এটি সময়ের প্রয়োজনের সাথে সংগতিপূর্ণ একটি দর্শনের ভিত্তি প্রদান করেছিল। বিজ্ঞান এবং ধর্মের মধ্যে একটি সমঝোতা প্রয়োজনীয় হয়ে পড়েছিল ততটাই, যতটা প্রয়োজন হয়েছিল রাজতন্ত্র এবং প্রজাতন্ত্রের ভিতর ও উচ্চ বুর্জোয়া এবং অভিজাতদের মধ্যে সমঝোতার। নিউটনের বিশ্ব ব্যবস্থায় ধর্মীয় গোঁড়ামি থেকে কিছু ছাড় এসেছিল, যেহেতু এর দ্বারা ঈশ্বরের হাত শুধুমাত্র এই সমগ্রের সাধারণ সৃষ্টি এবং সংগঠনের বিষয় ছাড়া, প্রতিটি স্বর্গীয় বা পার্থিব ঘটনার পিছনে দেখা হত না। এই সমঝোতা ডারউইন তছনছ করে দেন উনবিংশ শতকে। 

বৈজ্ঞানিক বিপ্লবের এই আপাতবিরোধিতা ছিল যে এতে সর্বাধিক অবদানকারী বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবকেরা, কোপার্নিকাস থেকে নিউটন পর্যন্ত, তাঁদের ধর্মীয় এবং দার্শনিক দৃষ্টিতে ছিলেন সবচেয়ে রক্ষণশীল। তাঁরা সেন্ট অ্যাকুইনাসের ধর্ম এবং যুক্তিকে মেলানোর কর্মসূচী গ্রহণ করেছিলেন, কিন্তু তাঁরা তাঁর সিদ্ধান্ত অস্বীকার করতেও বাধ্য হয়েছিলেন, কারণ বিশ্বের যে প্রকল্পের সাথে অ্যাকুইনাস তাঁর বিশ্বাসকে মেলাতে চেয়েছিলেন তা স্পষ্টতই অযৌক্তিক প্রমাণিত হয়েছিল। 

বার্নালের মতে, প্রাথমিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির এই সাফল্যের ভিতরে বিপদের উপাদানও ছিল। পদ্ধতিগুলিতে অন্তর্গত ছিল পুরনো ধারণাগুলির অনেকটাই যা প্রথম বিজ্ঞানীদের চিন্তাকে রঞ্জিত করেছিল এবং তাঁদের এবং পরীক্ষা থেকে উদ্ভূত নতুন ধারণাগুলিকে বিজ্ঞানের নতুন দর্শনে প্রবেশ করিয়েছিল। এই অচেতন অতীতের ধ্বংসাবশেষ এখন দেখা দিচ্ছে আজকের ভাববাদী বিজ্ঞানের তত্ত্বে; এবং হয়ত বিংশ শতকের বিজ্ঞানের প্রধান কাজ হবে নিউটনের ব্যবস্থাকে ভেঙে ফেলা, ঠিক যেমন সপ্তদশ শতকে অ্যারিস্টটলের ব্যবস্থাকে ভাঙা হয়েছিল।            


প্রকাশের তারিখ: ০৩-অক্টোবর-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫