সাম্প্রতিক সংখ্যা

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা

আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
বিপ্লবের দিনেই ভারতীয় বিপ্লবীদের টেলিগ্রাম
সৌভিক ঘোষ
কী ছিল সেই তারবার্তায়? ছিল ‘একনিষ্ঠ সংহতি’। ছিল প্রত্যয়ী ঘোষণা: ‘রুশ বিপ্লবের আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠ সংহতি জানিয়েই আমরা ঘোষণা করছি ভারত ও রাশিয়ার মুক্তি আন্দোলন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুক্তিসংগ্রামের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।’

নভেম্বর বিপ্লবের দিনই ভারতীয় বিপ্লবীদের টেলিগ্রাম পৌঁছেছিল পেত্রোগ্রাদে।
কী ছিল সেই তারবার্তায়? ছিল ‘একনিষ্ঠ সংহতি’। ছিল প্রত্যয়ী ঘোষণা: ‘রুশ বিপ্লবের আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠ সংহতি জানিয়েই আমরা ঘোষণা করছি ভারত ও রাশিয়ার মুক্তি আন্দোলন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুক্তিসংগ্রামের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ।’
বিপ্লবের প্রথম প্রহর
‘শ্রমিক ও সৈনিক প্রতিনিধিদের পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েত বিপন্ন। রেজিমেন্টকে আমরা নির্দেশ দিচ্ছি, অবিলম্বে যুদ্ধের জন্য তৈরি থেকে নতুন নির্দেশের অপেক্ষা করুন। এই নির্দেশ পালনে বিলম্ব বা অস্বীকৃতি বিপ্লবের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা বলে গণ্য হবে।
— সামরিক বিপ্লবী কমিটি।’
গোটা গোটা অক্ষরে এই লিফলেট পড়ার অনেক আগেই অবশ্য কেরেনস্কি বুঝে গিয়েছিলেন তারা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন। তবু আইনসভার ভিতরে ও বাইরে তিনি মরিয়া প্রচার চালান— রাশিয়া ছেড়ে অন্য কোথাও যাবেন না, তেমন পরিস্থিতি হলে বরং মৃত্যুবরণ করবেন। লিফলেট পড়া শেষ হলে বিপ্লবী সেনাবাহিনীকে ‘ছোটলোকের দল’ বলে গালি দেন অস্থায়ী সরকারের এক নম্বর ব্যক্তি।
কেরেনেস্কির ‘ছোটলোক’ সম্বোধিত বক্তৃতার পরেই স্মোলনির রাস্তার মোড়ে মোড়ে দেখা দিল লাল ফৌজ।
সেই ফৌজে মজদুরদের পোশাক গায়ে ছিলেন পিঠে রাইফেল আঁটা মজদুর যুবকরা।
৭ নভেম্বর দিনটিকেই বিপ্লবীরা নির্ধারণ করেছিলেন কেন?
লেনিনের যুক্তি ছিল ‘৬ নভেম্বর খুবই আগে হয়ে যাবে। অভ্যুত্থানের জন্য আমাদের দরকার একটা সারা রুশ ভিত্তি, অথচ ৬ নভেম্বরের মধ্যে কংগ্রেসের সমস্ত প্রতিনিধি এসে পৌঁছবে না। অন্যদিকে ৮ নভেম্বর খুবই দেরি হয়ে যাবে। ততদিনে কংগ্রেস বসে যাবে এবং মস্ত একটা সংগঠিত সভার পক্ষে দ্রুত ও চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া কঠিন। আমাদের ঘা মারতে হবে ৭ তারিখেই, যেদিন কংগ্রেস শুরু হবে, যাতে কংগ্রেসকে আমরা বলতে পারি এই রইল ক্ষমতা! বলুন কি করবেন?’
শ্রমিক রাষ্ট্রের পরিকল্পনা সফল হল।
বিপ্লব জয়ী হল।
সোভিয়েত বিপ্লবের মতো এত কম রক্তপাতে বিজয়ী হওয়ার নজির আর একটিও ইতিহাসে নেই।
বিজয়ের মুহূর্তে, বিপ্লবী সরকারের যখন ঘোষণা পাঠ চলছে, তখনও দুই তরফে ছিল দ্বিধা। একদিকে বাইরের দেশে পালিয়ে যাওয়া রাশিয়ার বিভিন্ন অভিজাত পরিবারগুলি, উঠতি বুর্জোয়া এবং তাদের মিত্ররা। এরা শ্রেণিস্বার্থেই বিপ্লবের বিরোধী, এরা কখনো ভাবেনি ‘ছোটলোকেরা’ ক্ষমতা দখল করবে। আরেকদিকে ছিলেন বিপ্লবী শিবিরের কিছু ব্যক্তি, যারা ইউরোপের শ্রমিকদের দিকেই তাকিয়ে থাকতে চেয়েছিলেন। এদের যুক্তি ছিল রাশিয়ায় বিপ্লব কিছুতেই টিকে থাকতে পারবে না, যদি না ইউরোপের শ্রমিকশ্রেণি নিজেদের দেশে বিপ্লবী অভ্যুত্থানে সমর্থ হয়।
দু’তরফের এহেন আশা-নিরাশা দুরমুশ করে দিয়েই সফল হয় রুশ বিপ্লব।
শুধু বিপ্লব-বিরোধীরাই নয়, লেনিনকে, কমিউনিস্ট (বলশেভিক) পার্টিকে এবং রুশ সর্বহারা-কৃষকদের জোটকে লড়তে হয়েছিল বিপ্লববাদীদের একটি অংশের বিরুদ্ধেও। দুই ফ্রন্টে লড়াই কঠিন কাজ ঠিকই, কিন্তু সেই লড়াইয়ে হারতেই হবে— এমন কথাও সবসময় সঠিক নয়।
ইউরোপের শ্রমিকশ্রেণির উপরে প্রয়োজনের তুলনায় বাড়তি নির্ভরতা কিংবা কোনোদিন যারা দেশ পরিচালনা করেনি তাদের সামর্থ্যের উপরে দরকারের চেয়ে বেশি সন্দেহ কোনটাই লেনিনের ছিল না— তাই সেদিনের রাশিয়া পরে সোভিয়েত ইউনিয়ন গড়ে তুলেছিল।
সেই টেলিগ্রাম
১৯১৭ সালের নভেম্বরের সেই দিন পার্টির ভিতরে থাকা অনেক পোড় খাওয়া বিপ্লবীরই পা কেঁপেছিল। তবে লেনিন একবারে একলা ছিলেন এমনও নয়— না পার্টি, কিংবা রাশিয়ার ভিতরে, না বাইরে। সেই সন্ধ্যায় শ্রমিক ও সেনাবাহিনীর পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের দপ্তরে একটি টেলিগ্রাম এসে পৌছয়। রুশ ভাষায় পরের দিন ‘নভোয়া জিজ্ন’ পত্রিকায় তা প্রকাশিত হয়।
টেলিগ্রামটি এসেছিল স্টকহোম থেকে।
পাঠিয়েছিলেন ভারতীয় বিপ্লবীরা।
কী ছিল সেই তারবার্তায়?
‘জাতি রাষ্ট্রগুলির জনসাধারণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারকে স্বীকৃতি দিয়েই সারা দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বিপ্লবী সংগ্রাম চালাচ্ছে রাশিয়া। প্যারিসের আলোচনায় রাশিয়ার পক্ষে যিনি বলতে এসেছেন সেই মহাশয় স্কোবেলেভ অবশ্য অন্য কথাই শুনিয়েছেন। তিনি যা বলেছেন তাতে ভারত, ইজিপ্ট ও আয়ারল্যান্ডের মতো দেশগুলির মূল সমস্যাই অধরা রয়ে যায়। এইসব দেশের জনসাধারণ নিজেদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকিবহাল। নিজেদের দেশে স্বাধীনতার সংগ্রামকে তারা এমন এক পর্যায়ে উন্নীত করেছেন যখন তাদের মূল সমস্যাটির সমাধান ব্যতিরেকে বিশ্বশান্তির আলোচনা আর চলে না। রুশ বিপ্লবের আদর্শের প্রতি একনিষ্ঠ সংহতি জানিয়েই আমরা ঘোষণা করছি ভারত ও রাশিয়ার মুক্তি আন্দোলন পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মুক্তিসংগ্রামের জন্য যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। প্যারিসের শান্তি সম্মেলনই হোক কিংবা শান্তিচুক্তির অন্য যে-কোনও ক্ষেত্র, নিষ্ঠুর ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আপনাদের সাহসী লড়াই আরও অদম্য হোক; শ্রমিক-সেনাবাহিনীর পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের প্রতি এই আমাদের আবেদন।’
স্টকহোমের বিপ্লবীরা
বার্লিন কমিটি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানি ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে থাকায় ভারতীয় বিপ্লবীদের একটি অংশ ‘শত্রুর শত্রুকে মিত্র’ হিসাবে ব্যবহারের নীতি গ্রহণ করেছিলেন। তাদের আশা ছিল ব্রিটিশ বিরোধিতার কারণেই জার্মানির থেকে অস্ত্র, অর্থ এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা সহজেই মিলবে। এরাই কিছুজন প্রবল বাধা কাটিয়ে জার্মানি পৌঁছন। তাঁরাই গড়ে তোলেন বার্লিন কমিটি। যদিও কিছুদিন পরেই তাদের সেই প্রত্যাশা পরিণত হয় হতাশায়।
১৯১৮ নাগাদ বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের (১৮৮০-১৯৩৭) লেখায় পাওয়া যাবে— ‘জার্মানরা শুধুমাত্র নিজেদের প্রয়োজনেই আমাদের ব্যবহার করতে চেয়েছিল, আমরা ছিলাম কার্যত যুদ্ধের বোড়ে’।
তাঁরা উপলব্ধি করেন মুখে যতই বলা হোক না কেন, জার্মানি ভারতীয় বিপ্লবীদের সাহায্যে কার্যকরী কিছুই করবে না। এমন সময় তাঁরা রাশিয়ার দিকে মনোযোগ দিয়েছিলেন। রুশ বিপ্লবের আহ্বান, অসম্পূর্ণ হলেও লেনিনের কিছু লেখা তাঁদের হাতে আসে। কমিউনিজম ও উপনিবেশগুলির জাতীয় মুক্তি সংগ্রাম যে একে অন্যের পরিপূরক, ‘জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার’ সম্পর্কে লেনিনের থিসিস যেমন হো চি মিনকে দিশা দেখিয়েছিল, তেমনই লড়াই কীভাবে করতে হবে সেই দিশা চিনতে পেরেছিলেন ভারতীয় বিপ্লবীরাও। তাঁরাই পাঠিয়েছিলেন ওই টেলিগ্রাম।
জার্মানির অসহযোগিতার সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার পর ১৯১৭-তেই তারা এমন একটি দেশে ঘাঁটি গড়তে চাইছিলেন, যেখানকার রাজনৈতিক পরিস্থিতি যুদ্ধরত দুই দিকের প্রতিই নিরপেক্ষ। সেই লক্ষ্যেই বার্লিন কমিটি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে স্টকহোমে পাঠায়। এর কিছুদিন পরে এম.পি.টি. আচার্যের সঙ্গে আরও কিছুজন সেখানে পৌঁছন— গড়ে ওঠে স্টকহোম ব্যুরো। এম.পি.টি. আচার্যই পরে মানবেন্দ্র নাথ রায়ের সঙ্গে তাসখন্দে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তুলেছিলেন।
বিদেশে ভারতীয় বিপ্লবীরা সহায়তা পেলেন
জার্মানি থেকে স্টকহোমে পৌছে ভারতীয় বিপ্লবীরা তখন নতুন করে বিপ্লবী সমিতির কেন্দ্র স্থাপন করছেন। ততদিনে ইউরোপের একাধিক সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটরা সেখানে বসবাস করতে শুরু করেছেন। এদের প্রায় সকলেই দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সদস্য ছিলেন। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়রা এদের সঙ্গেই যোগাযোগ করলেন। দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের সদস্যদের মধ্যে সংশোধনবাদীরাও ছিলেন (তখনও লেনিন বার্নস্টৈইনের মতবাদকে চুরমার করেননি)। এইসব দক্ষিণপন্থী সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটরা ভারতীয়দের কথাবার্তায় বিশেষ গুরুত্ব দেননি। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লিখছেন, ‘জাতিসমূহের মুক্তি আন্দোলনকে সোশ্যালিস্টরা আদৌ গুরুত্ব দিতে চান না, একথা আমরা ক্রমেই বুঝতে পারি’। প্রথমে জার্মানরা, পরে সোশ্যালিস্টরা তাঁদের হতাশ করলেন। এই পরিস্থিতিতে ভারতীয়দের সামনে নতুন বন্ধুর সন্ধান করা ছাড়া কোনও উপায় ছিল না। তারা দেখলেন একমাত্র রাশিয়ার বলশেভিকরাই সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইকে জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সাথে সম্পৃক্ত ও জরুরি বিবেচনা করছেন। উপনিবেশগুলিতে জাতীয় মুক্তি সংগ্রামকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছিলেন লেনিন, পরে এম.এন. রায়ের সঙ্গে ভারতে বিপ্লবের পথ নির্ধারণ সংক্রান্ত বিতর্কে তার মতামত আরও স্পষ্ট হয়।
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় যখন স্টকহোম পৌঁছন ততদিনে রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লব সংগঠিত হয়েছে। বলশেভিকরা সর্বহারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। রাশিয়ার বাইরেও একাধিক দেশে বলশেভিকদের পার্টি কেন্দ্র গড়ে ওঠে। স্টকহোমে পৌঁছে এমনই একটি কেন্দ্রের সন্ধান পেলেন চট্টোপাধ্যায়। সেই কেন্দ্র থেকে জার্মান ভাষায় একটি কাগজ (পিরিয়ডিক্যাল) প্রকাশিত হত। এই কাগজে লেখা হত বলশেভিকরা কী করতে চাইছে, সংগ্রামের রণনীতি ও রণকৌশল প্রসঙ্গে লেনিন কী বলছেন। চট্টোপাধ্যায় এই কাগজ হাতে পেলেন, লেনিনের লেখা পড়লেন এবং সিদ্ধান্ত নিলেন দীর্ঘদিন ধরে যে-বন্ধুর সন্ধানে তাঁরা একের পর এক দেশে ঘুরেছেন বলশেভিকরাই হলেন সেই শক্তি।
ব্রিটিশ শাসকরাও চট্টোপাধ্যায়দের স্টকহোম যাত্রা সম্পর্কে সজাগ ছিল। নিজেদের সাম্রাজ্যের শত্রুকে চিনে নিতে তারাও ভুল করেনি। স্টকহোম থেকে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত ভারতে তার পাঠিয়ে সতর্ক করেছিলেন, ‘রাশিয়ায় বিপ্লবী কেন্দ্র গড়ে তুলতে চাইছে এরা। লেনিন সহ ব্রিটিশ বিরোধী অন্যান্য রাশিয়ানদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করাই এদের প্রধান লক্ষ্য।’
বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় লেনিনের সাথে দেখা করতে সত্যিই আগ্রহী ছিলেন। যদিও তাঁদের দেখা হয়নি। ১৯৩৪ সালে লেনিনগ্রাদের ইউএসএসআর আকাদেমি অফ সায়েন্সেস-এর সম্মেলনে বক্তব্য রাখার সময় স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, ‘১৯১৭ সালে আমি যখন স্টকহোমে এসে পৌঁছই, তখন দেখি বিভিন্ন দেশ থেকেই দেশান্তরী বিপ্লবীরা সেখানে জড়ো হয়েছেন। তাঁরা প্রায় সকলেই একে অন্যের কাছে লেনিনের সন্ধান করছিলেন, সকলেই তাঁর সঙ্গে পরিচয় করতে আগ্রহী ছিলেন’। লেনিনের সাথে কখনো সরাসরি পরিচয়ের সুযোগ হয়নি বলে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ আক্ষেপ ছিল, সেই কথা তিনি বারে বারে উল্লেখ করেছেন।
প্যারিসের শান্তি সম্মেলন
ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ভারতীয় বিপ্লবীরা সকলেই উপলব্ধি করেছিলেন আন্তর্জাতিক ঘটনাবলী সম্পর্কে বলশেভিকদের দৃষ্টিভঙ্গিই সঠিক। সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াইকে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের সাথে সংযুক্ত করেছিলেন বলশেভিকরাই। বলশেভিকদের সাথে যোগাযোগ করার লক্ষ্যে ভারতীয় বিপ্লবীরা দ্রুত সিদ্ধান্ত নেন। সেই যোগাযোগই হয়েছিল স্টকহোমে।
এই সময়েই প্যারিসে শান্তি সম্মেলনের আয়োজন হয়। সেই সম্মেলনে বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতিতে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে মিত্রশক্তির অন্তর্গত দেশগুলির সরকার আলোচনায় বসে। রাশিয়ায় ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পরে তখন ক্ষমতাসীন হয়েছে অস্থায়ী (প্রভিন্সিয়াল) বুর্জোয়া সরকার। প্যারিসে সেই সরকারের প্রতিনিধি হিসাবেই উপস্থিত হন স্কোবেলেভ। ভারতীয় বিপ্লবীরা প্যারিসের সম্মেলনে প্রত্যেক পক্ষের বক্তব্যের দিকে নজর রেখে চলছিলেন। রাশিয়ার প্রতিনিধি স্কোবেলেভ নিজের বক্তব্যে ভারত ও অন্যান্য দেশের স্বাধীনতার লড়াই সম্পর্কে কিছুই বললেন না। বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়রা তখন পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের দিকে মনযোগী হলেন।
এই ছিল ওই টেলিগ্রাম পাঠানোর প্রেক্ষাপট।
ভারতের বলশেভিকরা
স্টকহোমে থাকতেই বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে এক রুশ বলশেভিকের পরিচয় হয়। তাঁর নাম ত্রয়ানোভক্সি। এই ত্রয়ানোভক্সির সঙ্গেই তিনি রাশিয়া-ভারতের সম্প্রীতিমূলক আন্তঃসম্পর্কের খসড়া প্রতিবেদন প্রস্তুত করেন। সেই খসড়াই আরও পরে পূর্বদেশীয় নিপীড়িত জনসাধারণের মুক্তি সংগ্রামের পরিকল্পনা বিষয়ক কর্মসূচিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।
অক্টোবর বিপ্লব সফল হওয়ার পরে ভারতীয় বিপ্লবীদের সাথে বলশেভিকদের সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়। স্টকহোম ব্যুরো থেকে রুশ ভাষাতেও ভারতীয়দের লড়াই-সংগ্রামের কথা নিয়মিত প্রকাশ হতে শুরু করে। লেনিনের সঙ্গে দেখা করতে বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বিশেষ আগ্রহ ছিলই, ত্রয়ানোভক্সি সেই বন্দোবস্তও করেন। বাধ সাধে জার্মান সরকার। তারা কিছুতেই চট্টোপাধ্যায়কে বলশেভিকদের দেশে ঢোকার সুযোগ দিতে চাননি। কারণ, ততদিনে তারা নিশ্চিত হয়েছেন, বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় একজন ভারতীয় বলশেভিক। জার্মানির মহাফেজখানায় এই সকল তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়। তাই সেবার স্টকহোম থেকে চট্টোপাধ্যায়ের রাশিয়া যাওয়া হল না।
ত্রয়ানোভক্সি রাশিয়া ফিরে গেলেন।
দেশে ফিরে তিনি পিপলস কমিশার অফ ফরেইন অ্যাফেয়ার্স দপ্তরের সহায়তায় পুনরায় বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে রাশিয়ায় আসতে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। সেই চিঠি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের হাতে কখনো পৌছয়নি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলে জার্মানি পরাজিত হয়। এইবার স্টকহোম ব্যুরো এবং বার্লিন কমিটির ভারতীয় বিপ্লবীরা রাশিয়ায় পৌঁছন।
ভারতীয়দের সাথে আন্তর্জাতিক শক্তিসমূহের বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস শেষ হল, একইসঙ্গে শুরু হয় বিপ্লবী সহযোগিতার নতুন ইতিহাস। সেই ইতিহাস একান্তই ভারত এবং রাশিয়া দুই দেশের সাম্যবাদীদেরই কৃতিত্ব।
তথ্যসূত্র—
১. Exerpts from ‘Galvanising Impact of the October Revolution on India’s National-Liberation Movement’ by Gangadhar Adhikary, Soviet Land, August 1977
২. দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন, জন রিড
৩. Reminiscences of Lenin: Nadezhda Krupskaya
৪. প্রবাসে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির গঠন: মুজফফ্র আহ্মদ
প্রকাশের তারিখ: ১৭-অক্টোবর-২০২২
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
