Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

'দ্য কন্ডিশন অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংলন্ড’— পুঁজিবাদের স্বরূপ চেনালেন এঙ্গেলস (প্রথম পর্ব)

অর্ণব ভট্টাচার্য
‘‘আমি এই চার্চের অধীনস্ত এলাকায় এরকম দৈন্য আগে কখনও দেখিনি। শ্রমিকদের ঘরে আসবাবপত্র বলতে কিছুই নেই। একই ঘরে দু-জোড়া দম্পতি থাকছে। একদিন সাতটি বাড়ি ঘুরে দেখলাম যে সেখানে একটিতেও বিছানা নেই, কোথাও খড় পর্যন্ত নেই। আশি বছরের বৃদ্ধকে বোর্ডের ওপর শুয়ে থাকতে দে‍‌খেছি। দুটি স্কট পরিবারের দুরবস্থা দেখলাম যারা মাত্র কয়েকমাস আগে গ্রাম থেকে এসেছে। এরই মধ্যে তাদের দুটি সন্তান মারা গিয়েছে এবং আরেকজন মুমূর্ষু। ঘরের এক কোণে কেবল প্রত্যেক পরিবারের জন্য খড়ের ছোটো একটি আঁটি রয়েছে। ভর দুপুরবেলায় ঘরটিতে এমন অন্ধকার যে আলো না-জ্বেলে মানুষের মুখ দেখা সম্ভব নয়— পাথরের হৃদয়েও আমাদের দেশের মানুষের এই দুর্দশা দেখে রক্তক্ষরণ হবে।’’
'The Condition of the Working Class in England'—Engels' Understanding of Capitalism: Part-1

ঊনবিংশ শতকের ইংলন্ডের সমাজজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কথাকার চার্লস ডিকেন্সের 'অলিভার ট্যুইস্ট' উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র অনাথ শিশু অলিভারকে একহাতা বাড়তি লপসি চাওয়ায় যে  কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হয়েছিল সেই কাহিনি হয়তো অনেকেরই জানা। তথাকথিত সুসভ্য পুঁজিবাদী ইংলন্ডে গরিব হওয়াকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করে কপর্দকহীন মানুষদের নিংড়ে নেওয়ার যে নির্মম ব্যবস্থা চালু হয়েছিল তাকে তীব্র সমালোচনা করেছেন ডিকেন্সের মতো কথাশিল্পীরা। জি.কে চেস্টারটন পুঁজিবাদের অমানবিকতায় ক্ষিপ্ত হয়ে একে 'another name for hell' বা নরকের নামান্তর বলেছিলেন। তবে এই অন্যায্য ব্যবস্থা থেকে মুক্তি কোন পথে তা নিয়ে যেমন অস্পষ্টতা ও ভাবালুতা ছিল তেমনই পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা এবং শ্রমজীবী মানুষের ওপর চলতে থাকা শোষণের চেহারা সম্পর্কে সামগ্রিক বোঝাপড়ার অভাবও ছিল। ১৮৪৫ সালে ফ্রেডরিখ এঙ্গেলসের লেখা ‘দ্য কন্ডিশন্‌স অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংলন্ড’ বইটি শিল্পবিপ্লবের পরবর্তীকালে পুঁজিবাদের বিকাশের বিভিন্ন দিক উন্মোচন করার ক্ষেত্রে এক ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করে। ছাত্রজীবনে হেগেলের চিন্তাধারায় প্রভাবিত তরুণ এঙ্গেলস কালক্রমে সাম্যবাদী ভাবধারার প্রতি আকৃষ্ট হন এবং জার্মানিতে ‘রাইনিশ জাইটুং’ পত্রিকায় শ্রমিকদের দুর্দশা নিয়ে বেনামে প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন। এঙ্গেলস-এর বাবা যিনি সে-সময়কার অন্যতম নামী শিল্পপতি ছিলেন তিনি ভেবেছিলেন যে ম্যাঞ্চেস্টারে পারিবারিক ব্যবসার কাজে ছেলেকে পাঠিয়ে দিলে হয়তো তার বৈপ্লবিক চিন্তায় বদল আসবে। সিনিয়র এঙ্গেলস-এর সে আশা পূরণ হয়নি। ইংলন্ডের শ্রমজীবী মানুষের নিদারুণ কষ্ট এঙ্গেলসকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে যার ফলশ্রুতি এই অসামান্য দলিল। ১৮৪২-৪৪ সালে দীর্ঘ ২১ মাস ইংলন্ডের নানা জায়গা ঘুরে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করে ও সমসাময়িক বিভিন্ন রিপোর্টের ভিত্তিতে এঙ্গেলস এই বইটি লেখেন।

এই বইটি পুঁজিবাদী বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ের ইতিহাস হিসেবে ভীষণ তাৎপর্যপূর্ণ। এই বইয়েই এঙ্গেলস সামাজিক রূপান্তরের সংগ্রামে শ্রমিকশ্রেণির বৈপ্লবিক ভূমিকা সম্পর্কে তার দৃঢ় বিশ্বাসকে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় প্রকাশ করেন। এঙ্গেলস অনুভব করেছিলেন যে শ্রমজীবি মানুষের কর্মজীবন ও সামাজিক জীবন সম্পর্কে বিস্তারিত জ্ঞান সমাজবদলের তত্ত্ব নির্মাণ করা এবং সমস্ত কল্প-কাহিনি ও আকাশকুসুম ভাবনার অবসান ঘটিয়ে বাস্তবের শক্ত জমিতে তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য একান্ত জরুরি। এই বইটির প্রথম জার্মান সংস্করণের মুখবন্ধে তিনি উল্লেখ করেন যে জার্মানিতে সমাজতন্ত্রী ও সাম্যবাদীদের বাস্তব জগৎ সম্পর্কে জ্ঞানের অভাব ছিল। যদিও জার্মানির শ্রমজীবীদের অবস্থা ইংলন্ডের মতো  ছিল না, কিন্তু সেখানেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থাই বিরাজমান ছিল যা আজ নয় কাল সেই চরম স্তরে পৌঁছবে। অতএব পুঁজিবাদের সাগরপারের রূপকে, সামাজিক দুর্দশার সেই "সর্বোচ্চ ও নগ্ন শিখরকে" জার্মানির সমাজতন্ত্রীদের কাছে তুলে ধরা এই বই লেখার অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল।১ জার্মান ভাষায় লেখা এই বইটি ১৩টি অধ্যায়ে বিভক্ত। এর প্রথম ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৮৮৫ সালে। এঙ্গেলস এই গ্রন্থটি গ্রেট ব্রিটেনের শ্রমজীবী মানুষকে উৎসর্গ করেন।

১৮৩০ এর দশক থেকেই ইউরোপে ক্রমশ সর্বহারা শ্রেণির সাথে বুর্জোয়াদের সামাজিক দ্বন্দ্ব প্রবল হতে থাকে। ক্রমবর্ধমান সামাজিক সংকটের সাথে সাথে বিকশিত হতে থাকে শ্রমজীবীদের আন্দোলন। পশ্চিম ইউরোপে শ্রমিক শ্রেণির অবস্থা নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। তবে এঙ্গেলসই প্রথম এই বইয়ে শ্রমিকশ্রেণি সম্পর্কে সামগ্রিক ভাবে আলোচনা করেন। তাছাড়া কেবল শ্রমজীবীদের দুরবস্থার বিবরণ দেওয়া নয়, এই বইটিতে এঙ্গেলস  পুঁজিবাদের বিকাশের রূপরেখা ও সামাজিক প্রভাব সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন। সর্বোপরি এটি সমাজের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদী বিশ্লেষণের প্রথম নিদর্শন।

এঙ্গেলসের প্রধান আলোচ্য বিষয় বস্ত্রশিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের দুর্দশা হলেও তিনি কয়লাখনির শ্রমিক, কৃষিশ্রমিকদের দুরবস্থা এবং শ্রমিকশ্রেণির সংগ্রামের বিবরণ দিয়েছেন।  শ্রমজীবী মানুষের ওপর চলমান শোষণের স্বরূপ বোঝার জন্য এঙ্গেলস শ্রমিক মহল্লায় দীর্ঘ সময় কাটিয়েছিলেন। তিনি বলেন, ''I wanted more than a mere abstract knowledge of my subject. I wanted to see you in your home..."২ অর্থাৎ নৈর্ব্যক্তিক জ্ঞান যথেষ্ট নয়, এঙ্গেলসের কাছে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত জরুরি। ভোগবিলাসের পাশ কাটিয়ে বাস্তব জীবনের যে-রূপ তিনি দেখেছেন তা কঠোর, নির্মম হলেও তার মধ্যে তিনি শ্রমজীবী মানুষের মহত্ব উপলব্ধি করেছেন। এঙ্গেলস লিখেছেন— ‘I forsook the company and the dinner parties, the port-wine and champagne of the middle classes, and devoted my leisure hours almost exclusively to the intercourse with plain Working-Men, thus I was induced to spend many a happy hour in obtaining the knowledge of the realities of life, many an hour which else would have been wasted in fashionable talk and tiresome ettiquette’,৩ অর্থাৎ বুর্জোয়াদের জীবনের বিলাসিতা— ডিনার পার্টি বা শ্যাম্পেন পানকে উপেক্ষা করে অবসর সময়ে এঙ্গেলস ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলেছেন শ্রমজীবী মানুষের সাথে, বাস্তব জীবনকে চিনেছেন, তাদের সুখ-দুঃখ, অভাব-অভিযোগ উপলব্ধি করেছেন, বাস্তব অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ হয়েছেন।

শিল্পবিপ্লবের পর ইংলন্ডে শ্রমিকশ্রেণি পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সাথে অবিচ্ছেদ্য শ্রেণি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। এই সময় ব্যাপকহারে  উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও তা শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে উন্নততর করেনি বরং তাদের জীবনকে সবদিক দিয়ে সমস্যাকীর্ণ করে তোলে এবং জীবনমানের ব্যাপক অবনমন ঘটায়। ইংলন্ডের বড়ো বড়ো শিল্পশহরগুলিতে কারখানার শ্রমিকরা উদয়াস্ত পরিশ্রম করার পর তাদের মৌলিক চাহিদাগুলি অর্থাৎ খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থানের অধিকার পাওয়ার ক্ষেত্রে  কী নিদারুণ বঞ্চনার শিকার হতেন তা স্বচক্ষে দেখেছেন এঙ্গেলস। তার পাশাপাশি সমসাময়িক নানা কমিশনের রিপোর্ট,  সংবাদপত্রের খবর সংগ্রহ করে পুঁজিবাদের লুঠেরা চেহারার স্বরূপ অনুধাবন করেছেন। শ্রমজীবিদের সামাজিক ও আর্থিক দুর্গতি কোন শিখরে পৌঁছে ছিল তা এই বইটির ছত্রে ছত্রে একের পর এক রিপোর্ট উদ্ধৃত করে দেখানো হয়েছে। বইটির ভূমিকায় শিল্পবিপ্লবের আগে ও পরে শ্রমজীবীদের অবস্থা, যন্ত্রচালিত উৎপাদন ব্যবস্থায় শ্রমিকদের অবস্থান, নানাবিধ শিল্প উৎপাদন এবং সংশ্লিষ্ট শিল্পপণ্যের বাণিজ্যের পরিমাণ এই সবই তথ্যনিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে শিল্প শ্রমিকের প্রকারভেদ, পুঁজির কেন্দ্রীভবন এবং বড়ো বড়ো জনাকীর্ণ শিল্পশহরে মেহনতী জনগণের বসবাসের প্রসঙ্গ আলোচনা করা হয়েছে। পরবর্তী অধ্যায়ে তাদের জীবনযাপনের মর্মান্তিক চিত্র তুলে ধরেছেন এঙ্গেলস।

ঊনবিংশ শতকের ইংলন্ডের শ্রমিকদের ঘরদোর, পোষাক-পরিচ্ছদ

প্রথমেই এঙ্গেলস আলোচনা করেছেন বড়ো বড়ো শহরে শ্রমজীবী মানুষের মহল্লাগুলির দুরবস্থা নিয়ে। তুলে ধরেছেন নানা সাক্ষ্যপ্রমাণ। এডিনবার্গের পুরোনো গির্জার যাজক ড. লি ১৮৩৬ সালে কমিশন অব রিলিজিয়াস ইনস্ট্রাকশনের সামনে অকপটে জানান: ‘‘আমি এই চার্চের অধীনস্ত এলাকায় এরকম দৈন্য আগে কখনও দেখিনি। শ্রমিকদের ঘরে আসবাবপত্র বলতে কিছুই নেই। একই ঘরে দু-জোড়া দম্পতি থাকছে। একদিন সাতটি বাড়ি ঘুরে দেখলাম যে সেখানে একটিতেও বিছানা নেই, কোথাও খড় পর্যন্ত নেই। আশি বছরের বৃদ্ধকে বোর্ডের ওপর শুয়ে থাকতে দে‍‌খেছি। দুটি স্কট পরিবারের দুরবস্থা দেখলাম যারা মাত্র কয়েকমাস আগে গ্রাম থেকে এসেছে। এরই মধ্যে তাদের দুটি সন্তান মারা গিয়েছে এবং আরেকজন মুমূর্ষু। ঘরের এক কোণে কেবল প্রত্যেক পরিবারের জন্য খড়ের ছোটো একটি আঁটি রয়েছে। ভর দুপুরবেলায় ঘরটিতে এমন অন্ধকার যে আলো না-জ্বেলে মানুষের মুখ দেখা সম্ভব নয়— পাথরের হৃদয়েও আমাদের দেশের মানুষের এই দুর্দশা দেখে রক্তক্ষরণ হবে।’’

এডিনবার্গ মেডিক্যাল অ্যান্ড সার্জিক্যাল জার্নালে ডা. হেনেন একইরকম অভিজ্ঞতার কথা লিখেছেন। ব্রিটিশ পার্লা‍মেন্টের রিপোর্টেও এডিনবার্গের দরিদ্র মানুষের আবাসনের দৈন্যদশার কথা আলোচিত হয়েছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শিল্পশহর লিভারপুলের গরিব শ্রমজীবীদের অবস্থাও ছিল ভয়াবহ। সেখানে ৪৫ হাজার মানুষ সংকীর্ণ, অন্ধকার, স্যাঁতসেঁতে ঘরে থাকতেন। এই ঘরগুলি অধিকাংশই ‘সেলার কক্ষ’ অর্থাৎ মাটির নিচের কুঠুরি যেগুলিতে হাওয়া চলাচলের ব্যবস্থা অত্যন্ত খারাপ।

গ্লাসগো শহরের বাসিন্দা ৩ লক্ষ মানুষের মধ্যে ৭৮ শতাংশই শ্রমজীবী যাদের দুরবস্থা এডিনবার্গ বা লিভারপুলের শ্রমিকদের মতোই। গ্লাসগোর শ্রমিক মহল্লার করুণ অবস্থার বিবরণ পাওয়া যায় সরকারি আধিকারিক জে সি সাইমন্সের বয়ানে— ‘‘বিশ্বের কোনো সভ্য দেশের কোথাও যে এই বিপুল দৈন্য, ক্লেদ, অপরাধ ও ব্যাধির অস্তিত্ব থাকতে পারে তা গ্লাসগোর সর্পিল গলি না-দেখলে আমি বিশ্বাস করতে পারতাম না... এখানকার বাসস্থানগুলি এতটাই নোংরা, স্যাঁতসেঁতে ও ভগ্নদশাপ্রাপ্ত যে ঘোড়ার আস্তাবল হিসেবেও এগুলিকে কেউ গণ্য কর‍‌বে না।’’ ম্যাঞ্চেস্টার, ইয়র্কশায়ার, ল্যাঙ্কাশায়ার সর্বত্র একই চিত্র। এঙ্গেলস শ্রমিক মহল্লাগুলির অবর্ণনীয় দুরবস্থার সাথে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তদের বাসস্থানের তুলনা করে দেখিয়েছেন যে স্বচ্ছল ও বিত্তশালীরা স্বাস্থ্যকর, পরিচ্ছন্ন এলাকায় আরামে বসবাস করত। শুধু তাই নয় তাদের কর্মস্থলে যাতায়াতের পথও এমনভাবেই নির্দিষ্ট ছিল যাতে এই ভয়ঙ্কর দৈন্য তাদের দৃষ্টিগোচর না-হয় এবং কোনোরকম বিবেকের দংশন তারা অনুভব না-করে।

ঊনবিংশ শতকের ইংলন্ডে পুঁজিপতিদের মুনাফা অর্জনের লালসা এত উত্তুঙ্গ স্তরে পৌঁছেছিল যে, শ্রমজীবী মানুষ পশুরও অধম জীবনযাপন করছে সে-বিষয়ে তারা ভ্রুক্ষেপও করত না। এই অস্বাস্থ্যকর, পূতিগন্ধময় পরিবেশ ছিল নানাবিধ রোগের সূতিকাঘর। কেবল গোটা শহরে যখন কোনো রোগের প্রাদুর্ভাব দেখার সম্ভাবনা সৃষ্টি হতো তখন টনক নড়তো সরকারের। পাঠানো হতো পুলিশ, তৈরি হতো কমিশন। ১৮৩১ সালে ম্যাঞ্চেস্টার শহরে কলেরার মহামারি ছড়িয়ে পড়বার উপক্রম হলে হেল্‌থ কমিশন গঠন করা হয়। এই কমিশনের সদস্য ডা. কে প্রায় সমগ্র ম্যাঞ্চেস্টার শহর পরিদর্শন করে যে-রিপোর্ট দেন তাতে উল্লেখ করেন যে, শ্রমজীবীদের বাড়িগুলির প্রায় ৪০ শতাংশের ভেতরের দেওয়ালে চুনকাম করা প্রয়োজন ছিল, প্রায় ১৫ শতাংশ বাড়ির ছিল ভগ্নদশা। বিভিন্ন জায়গায় নোংরা জল, আবর্জনা, ভগ্নস্তূপ ছিল। সরকারি নথিতেই স্পষ্ট যে ম্যাঞ্চেস্টারের সাড়ে তিন লক্ষ শ্রমিক কী মনুষ্যেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হতেন।

ইংলন্ডে পুঁজিবাদ এত দ্রুতগতিতে বিকশিত হতে পারত না যদি বিপুল সংখ্যক দুঃস্থ আইরিশ শ্রমিককে যৎসামান্য মজুরিতে নিয়োগ করা না-যেত। দশ লক্ষেরও বেশি গরিব আইরিশ জনতা সে-দেশে মনুষ্যেতর জীবনযাপন করত। ইংলন্ডের পুঁজিপতিরা শ্রমের এই বিপুল মজুত ভাণ্ডারকে নির্বিচারে ব্যবহার করত। এদের চাহিদা অত্যন্ত কম হওয়ায় যে-কোনো শর্তে তাদের নিয়োগ করা যেত, ফলে ইংরেজ শ্রমিকদের দরকষাকষির ক্ষমতা কমে যেত। আইরিশ শ্রমিকদের জীবনমান বোঝার জন্য একটি উদাহরণই যথেষ্ট। ডা. কে-র বিবরণ অনুযায়ী একটি মাত্র বিছানাতেই এক‍‌টি ‍‌গোটা আইরিশ পরিবারকে ‍‌তিনি বাস করতে দেখেছেন। নোংরা খড় এবং পুরোনো বস্তাকেই বিছানা হিসেবে এবং সেগুলিকেই আচ্ছাদন হিসেবে ব্যবহার করতেন তারা। একটি স্যাঁতসেঁতে ঘরে ১২ থেকে ১৬ জন কোনো মতে গাদাগাদি করে থাকতেন, তাদের সাথেই কখনও থাকত শূকর ও অন্যান্য পশু।

শ্রমজীবী মানুষের জীবনযাপনের প্রতিটি দিকের প্রতি নজর দিয়েছিলেন এঙ্গেলস। তাই গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করেছেন তাদের পোশাক-পরিচ্ছদ নিয়ে। দুঃস্থ শ্রমিকদের পোশাক-পরিচ্ছদ ‌আবহাওয়ার সাথে মানানসই ছিল না। ইংলন্ডের স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় গরম পোশাক বিশেষত ফ্লানেলের পোশাক পরা প্রয়োজন যা স্বচ্ছল মধ্যবিত্তশ্রেণি ব্যবহার করে। কিন্তু শ্রমজীবী মানুষ উলের ‍‌কোনোরকম পোশাক কিনতেই সক্ষম না-হওয়ায় মোটা কাপড়ের জামা পড়তে বাধ্য হতেন যা ইংলন্ডের আবহাওয়ায় একেবারেই অনুপযুক্ত। আইরিশ শ্রমিকদের পোশাক ছিল সবচেয়ে জরাজীর্ণ। তাদের অধিকাংশের জুতো পড়ার সামর্থ্যও ছিল না।
স্বাভাবিকভাবেই তারা ঠান্ডায় কাবু হয়ে রোগাক্রান্ত হয়ে পড়তেন। শ্রমিকের যথেচ্ছ জোগান থাকায় এসব নিয়ে ভাবার চেষ্টাও করতেন না পুঁজিপতিরা।
(চলবে...)


তথ্যসূত্র—
১। দ্য কন্ডিশনস অব দ্য ওয়ার্কিং ক্লাস ইন ইংলন্ড, পেঙ্গুইন সংস্করণ, ১৯৮৭, পৃ-৩১
২। ঐ, পৃ-৪২
৩। ঐ
৪। ঐ, পৃ-৫০
৫। ঐ
৬। ঐ, পৃ-৫২
৭। ঐ, পৃ ৫৮-৬৭
৮। ঐ, পৃ ৮২
৯। ঐ, পৃ ৬৮


প্রকাশের তারিখ: ২৮-নভেম্বর-২০২৩
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫