Latest Edition

সাম্প্রতিক সংখ্যা

Latest Edition

মার্কসবাদী পথ প্রকাশনা
Latest Edition


Donate Now আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay

রোজা লুক্সেমবার্গের জীবন ও চিন্তা- তৃতীয় পর্ব

চিরশ্রী দাশগুপ্ত
রোজা লুক্সেমবার্গের জীবনের আরেকটি দিক তুলে ধরা দরকার সেটা হল মৃত্যুদণ্ড ও জেলখানার বন্দীদের পরিস্থিতি বিষয়ে তাঁর বিরোধিতা। অধ্যাপক ইরফান হাবিব উল্লেখ করেছেন, ১৯১৮ সালের ৯ই নভেম্বর রোজা যখন জেল থেকে ছাড়া পেলেন সেটা জার্মানি জুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিপ্লবী অভ্যুত্থানের সময়। মুক্তি পাবার পর রোজা এই বিষয়ে লিখেছিলেন। স্বাস্থ্য ভালো ছিল না তা সত্ত্বেও তিনি লড়াইয়ের কর্মকান্ডে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে বিষয়ে লিখলেন, তা হল মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির সমালোচনা।
The Life and Thoughts of Rosa Luxemburg – Part III

এই প্যানেল-এ যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে আমার কথা ভাবার জন্য সেন্টার ফর উইমেন’স ডেভলপমেন্ট স্টাডিস ও রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশান-এর আছে আমি অত্যন্ত কৃতজ্ঞ। এমন সব বিদগ্ধ মানুষদের সঙ্গে এই প্যানেল-এ যোগ দেওয়া সত্যিই ভয়ের। এখনো অবধি যা বলা হয়েছে তারপর আরও কিছু যুক্ত করার কথা ভাবা বেশ কঠিন।

সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্বার্থে উৎসর্গীকৃত জীবন এমনকী মৃত্যুতেও রোজা লুক্সেমবার্গ এতখানি বুদ্ধিমত্তা ও মনের জোর দেখিয়েছিলেন যে যাঁরা তাঁর সমালোচক তাঁদের থেকেও অকুন্ঠ শ্রদ্ধা অর্জন করে নিতে পেরেছেন। অধ্যাপক ইরফান হাবিব এবং অন্যান্যরাও এ কথা উল্লেখ করেছেন যে রোজার জীবন এবং সময়কে বোঝা, আমরা যারা এই মুহূর্তে এই ঘরে বসে রয়েছি এবং যারা এই সময়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করছি, তাদের কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ২০০৪ সালে অ্যাড্রিয়েন রিচ বলেছিলেন ‘একুশ শতকে রোজা লুক্সেমবার্গের প্রবেশ এক বার্তাবহ পক্ষীদূতের মত, যে বিস্তৃত মহাদেশ এবং ইতিহাসকে অতিক্রম করে আমাদের মনে করিয়ে দেয় আমাদের এই বর্তমান বিচ্ছিন্ন বা নতুন কিছু নয় বরং মানুষের দীর্ঘকালীন দ্বন্দ্বের ইতিহাসের অবিচ্ছিন্ন সম্প্রসারণ। রোজার তীক্ষ্ণ বিশ্লেষণী বুদ্ধিমত্তা এবং অদম্য সাহসের কথা কেবল তাঁর নিজের সময়ে নয় আমাদের সময়কালের জন্যও বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।’

কেমন ছিলেন তিনি, সেই নারী যিনি একশো বছরের ওপার থেকে আমাদের জন্য বার্তা বহন করে নিয়ে আসেন? ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে রোজা নিহত হবার আট মাস পরে তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও কমরেড ক্লারা জেটকিন লিখেছিলেন ‘রোজা লুক্সেমবার্গ ছিলেন অদম্য ইচ্ছাশক্তির অধিকারিণী। তীব্র আত্মসংযম তাঁর তেজ আর মেজাজী স্বভাবকে সংহত করে রেখেছিল, আপাত গম্ভীর, স্বল্পভাষী ও শান্ত ব্যবহারের আড়ালে তা ঢাকা পড়ে থাকত। কাজের ক্ষেত্রে নিজে ছিলেন অত্যন্ত সুশৃঙ্খল, সহজাতভাবেই বন্ধুদের খুব প্রশ্রয় দিতেন; নিজের বিপদ-আপদের চাইতেও বন্ধুদের দুঃখ-দুর্দশা, সংকট তাঁকে বিচলিত করত বেশি। বন্ধু হিসেবে তিনি ছিলেন বিশ্বস্ততা, ভালোবাসার প্রতিমূর্তি, একইসঙ্গে ছিলেন নিঃস্বার্থতা আর একাগ্রতার আদর্শ।  

রোজার মতাদর্শ ও সংকল্প বিষয়ে অধ্যাপক ইরফান হাবিব ও অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়েক (১৫ ও ১৬ জানুয়ারি ২০২৪ তারিখে মার্কসবাদী পথ-এর ওয়েবসাইট-এ প্রকাশিত অধ্যাপক ইরফান হাবিব ও অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়েক-এর বক্তব্যের অনূদিত নিবন্ধরূপ দ্রষ্টব্য) ইতিমধ্যেই অনেক কিছু বলেছেন। তার সঙ্গে আরও কিছু বিষয় আমি যুক্ত করতে চাই। একেবারে শুরুতেই যে কথাটা বলব তা হল রোজা লুক্সেমবার্গের জীবনের একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল তাঁর উৎসাহ ও অনুভূতিপূর্ণ মানবতাবোধ যার দ্বারা পরিচালিত হয়ে তিনি ঔপনিবেশিকতা, সাম্রাজ্যবাদ, সামরিকীকরণ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে আপসহীন অবস্থান নিতে পেরেছিলেন। রোজার যে বিশ্লেষণী বিচার-বুদ্ধি আর চেতনার কথা আলোচনায় উঠে এসেছে এটা তারই ফসল। 

১৯১৩ সালে প্রায় ভবিষ্যৎবাণী করার মত করে রোজা বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছিলেন কীভাবে একটি বিশ্বযুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে এই কথাগুলো তিনি যখন লিখলেন তার এক বছরের মধ্যেই যুদ্ধও শুরু হল : ‘পুঁজিবাদের ইতিহাসের শৈশবাবস্থা থেকেই তার সঙ্গী ছিল অস্ত্র, যুদ্ধ, আন্তর্জাতিক বিরোধ ও ঔপনিবেশিক রাজনীতি। এই উপাদানগুলি একত্রিত হয়ে এমন এক চরম অবস্থা তৈরি করেছে যে যাবতীয় বিরোধ একযোগে ফেটে পড়ছে এবং তারই ফলশ্রুতিতে আধুনিক সমাজব্যবস্থার যাত্রাপথে এক নতুন যুগের সূত্রপাত হয়েছে। সাম্রাজ্যবাদ এখন তার চূড়ান্ত পর্বে উপনীত হয়েছে – পুঁজি গোটা পৃথিবীকে টুকরো টুকরো করে ফেলেছে। সবকটি পুঁজিবাদী দেশের পারস্পরিক শত্রুতার কারণে মাটি ও সমুদ্রব্যাপী ধারাবাহিক যুদ্ধের অবিরাম আয়োজন চলছে এবং আফ্রিকা থেকে ইওরোপ পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ছে। এর ফলে যে কোনও মুহূর্তে একটি ছোট্ট স্ফুলিঙ্গ বিশ্বব্যাপী অগ্নিকান্ডে পর্যবসিত হবে।’

রোজা এইটা লিখেছিলেন ১৯১৩ সালে এবং তার ঠিক পরেই যুদ্ধ-বিরোধী বক্তব্য পেশ করে সাধারণ মানুষকে অবাধ্যতায় প্ররোচনা দেওয়া হচ্ছে এই অভিযোগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। বিচারকদের সামনে তিনি যে বক্তব্য রেখেছিলেন তাইতেই তাঁর অনমনীয় মনোভাব টের পাওয়া যায়। তিনি বলেন, ‘১৯১৩ সাল জুড়ে আপনাদের অসংখ্য সহকর্মী ঘাম ঝরিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম করে কেবল আমাদের সাংবাদিকদেরই মোট ষাট মাসের জেলবন্দী থাকার ব্যবস্থা করেছেন… এতজনকে শাস্তি দিয়েও একজন সোশাল ডেমোক্র্যাটকেও কি আপনারা তার কর্তব্যের পথ থেকে সরিয়ে দিতে পেরেছেন বলে মনে করেন? আমাদের কাজ আপনাদের মাকড়সার জালের মত ক্রিমিনাল কোডকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে, তাই যতই শাস্তি দিন, আমাদের কাজ এগিয়ে যাবে। ইনি (প্রসিকিউটর) অবিলম্বে আমার গ্রেপ্তারির দাবি করেছেন। স্যার, আমার এই বিশ্বাস রয়েছে যে আপনি পালিয়ে যেতেই পারেন; কিন্তু একজন সোশাল ডেমোক্র্যাট তা করে না। সে নিজের কৃতকর্মের সমর্থনে অটল থাকে এবং আপনাদের বিচারব্যবস্থাকে সহাস্যে উড়িয়ে দিতে পারে। এখন আমাকে যা শাস্তি দেবার, দিন।’

সত্যি সত্যিই তাঁকে বারো মাসের জন্য জেলে পাঠানো হল। তারপর আবার সাজা হল আড়াই বছরের জন্য একেবারে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শেষ অব্দি। যদিও কোর্টে তিনি নিজের দলের পক্ষে সওয়াল করেছিলেন, কিন্তু, যখন তারা উগ্র জাতীয়তাবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করল, যখন জাতির অস্তিত্বরক্ষার নামে তারা যুদ্ধের লাভের পক্ষে কথা বলল - যার ফলে জার্মান শাসকরা প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির অংশগ্রহণের আর্থিক ব্যয়ভার বহন করতে রাজি হল, তখন তিনি জার্মান সোশাল ডেমোক্র্যাটদের সমালোচনা করতে পিছপা হননি। অধ্যাপক ইরফান হাবিব যে কথা ইতিমধ্যে উল্লেখ করেছেন।  

তবে রোজার যে কথাগুলির প্রতিধ্বনি আজকের সময়ে সবচেয়ে বেশি করে শুনতে পাওয়া যায়, তা হ্‌ ১৯১৬ সালের জুনিয়াস প্যামফ্লেট-এ যুদ্ধকালীন ঘটনাবলীর যে বিবরণ তিনি লিখেছিলেন। যখন লিখেছিলেন তখন তিনি জেলে বন্দী। এই প্যামফ্লেট আমাদের মনে করিয়ে দেয় যুদ্ধের সময়ে জার্মানির পরিস্থিতি কীরকম ছিল। একইসঙ্গে আমাদের বর্তমান সময়ে চারপাশে যে সব ঘটনা ঘটে চলেছে তারও একটা অস্বস্তিকর প্রতিচ্ছবি এই কথাগুলোয় ফুটে ওঠে।

‘প্রাথমিক উত্তেজনা কেটে গেছে। রাস্তাঘাটে স্বদেশভক্তির প্রদর্শনী আর নেই, নেই সন্দেহজনক চেহারার গাড়ির পিছনে ধাওয়া করা, মিথ্যে টেলিগ্রাম, কলেরার বিষে ভর্তি কুয়ো। বার্লিনের প্রতিটি সেতু থেকে বোমা নিক্ষেপ করা যেসব রুশ ছাত্রদের গল্প শোনা যেত তারা নেই, ন্যুরেমবার্গে উড়ে যাওয়া ফরাসীদের গল্পগুলো নেই; নেই সেইসব অগণিত মানুষজন যারা সবসময় চারিদিকে গুপ্তচর শিকার করে বেড়াত, নেই ভিড় করে গান গাওয়া, কফির দোকানে দেশাত্মবোধক গান; নেই হিংস্র, উন্মত্ত, নারী নির্যাতনে সদাপ্রস্তুত ক্ষিপ্ত জনতা যারা সামান্যতম গুজবেও উৎকট উত্তেজনায় ফেটে পড়ত; নেই আনুষ্ঠানিক হত্যালীলা… ধ্বংসের অবশিষ্টের উপরে চলছে ব্যবসা। শহর পরিণত হয়েছে ধ্বংসস্তুপে, আস্ত দেশগুলো হয়ে গেছে মরূভূমি, গ্রামগুলো হয়ে গেছে কবরখানা আর এক একটা জাতি ভিখারি হয়ে গেছে… অপমানিত, অসম্মানিত, রক্তাক্ত এবং ক্লেদাক্ত… এই হল পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার চেহারা। এই চেহারাটা সচরাচর আমরা দেখতে পাই না, আমরা তাকে দেখি শান্তি এবং ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, দর্শন আর নীতিবোধের পরাকাষ্ঠা হিসেবে, কিন্তু এখন তার উন্মত্ত পশুবৎ নৈরাজ্যবাদী, ব্যাভিচার-সর্বস্ব, সংস্কৃতি-মানবতাবিধ্বংসী চেহারাটা নগ্ন হয়ে পড়েছে।’    

এরপরে রোজা যুক্তি সাজিয়ে বলছেন যুদ্ধ আসলে সুশৃঙ্খলভাবে সংগঠিত বিরাট গণহত্যা। কিন্তু সাধারণ মানুষের পক্ষে এমন শৃঙ্খলাবদ্ধ হত্যাকাণ্ডে তখনই অংশগ্রহণ করা সম্ভব যখন ইতিমধ্যেই একটা উন্মাদনার পরিস্থিতি তৈরি করা হয়ে গেছে। তিনি বলছেন, যারা যুদ্ধ ঘটায়, তারা এই পদ্ধতিকে ব্যবহার করে কারণ এটা প্রমাণিত যে এই পদ্ধতিটাই কাজে দেয় এবং আরও বলছেন, ‘পাশবিক আচরণের জন্য প্রয়োজন সমতুল্য পাশবিক চিন্তা ও বোধ। প্রথমটির সঙ্গেই দ্বিতীয়টির প্রস্তুতি ও উপস্থিতি আবশ্যিক।’ পুলওয়ামা কাণ্ড ঘটে গিয়েছে কিছুদিন আগেই তাই আজ এই মন্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে আর আলাদা করে খুব বেশি কিছু বলার প্রয়োজন নেই। এটুকুই উল্লেখ করব যে, যখন সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা উগ্র জাতীয়তাবাদের কাছে নিজেদের সমর্পণ করেছিল তার বিরুদ্ধে এই ছিল রোজা লুক্সেমবার্গের প্রতিক্রিয়া ও বিকল্প প্রস্তাব।  

রোজা লুক্সেমবার্গের জীবনের আরেকটি দিক তুলে ধরা দরকার সেটা হল মৃত্যুদণ্ড ও জেলখানার বন্দীদের পরিস্থিতি বিষয়ে তাঁর বিরোধিতা। অধ্যাপক ইরফান হাবিব উল্লেখ করেছেন, ১৯১৮ সালের ৯ই নভেম্বর রোজা যখন জেল থেকে ছাড়া পেলেন সেটা জার্মানি জুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিপ্লবী অভ্যুত্থানের সময়। মুক্তি পাবার পর রোজা এই বিষয়ে লিখেছিলেন। স্বাস্থ্য ভালো ছিল না তা সত্ত্বেও তিনি লড়াইয়ের কর্মকান্ডে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। মুক্তি পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই যে বিষয়ে লিখলেন, তা হল মৃত্যুদণ্ডের শাস্তির সমালোচনা। এই লেখায় তিনি দাবি করলেন, শেকল পরিয়ে বেঁধে রাখা, শারীরিক নির্যাতন ইত্যাদি বর্বর শাস্তিমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটানো হোক। কারাবাসের নানান নিয়মকানুন ও মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে তিনি যে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, তার ভিত্তি ছিল কারাবন্দী থাকাকালীন তাঁর স্ব-অর্জিত নানান বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং তিনি বলেছিলেন এই প্রথার বিরোধিতা করা তাঁর ‘সম্মাননীয় কর্তব্য’।  

তৃতীয় যে বিষয়টি নিয়ে আমি আলোচনা করতে চেয়েছিলাম এবং জানি না করা উচিত হবে কিনা কারণ এর আগেই অ্যাকিউমুলেশন অব ক্যাপিটাল এবং রোজার পোলিটিক্যাল ইকোনমি চর্চা বিষয়ে অনেকটা আলোচনা হয়েছে। যাই হোক আমি বলতে চাই অ্যাকিউমুলেশন অব ক্যাপিটাল লেখার অনেক আগেই যখন তাঁর বয়স বিশের কোঠায় সেই সময়ে রোজা যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছিলেন যে আধুনিক শ্রম আন্দোলনের সামগ্রিক শক্তি তাত্ত্বিক জ্ঞানের উপরে নির্ভর করে রয়েছে। তিনি এই মন্তব্য করেছিলেন এডওয়ার্ড বার্নস্টেইনের সঙ্গে তর্ক চলাকালীন; বার্নস্টেইনের তত্ত্ব - পুঁজিবাদী ব্যবস্থা ক্রেডিট সিস্টেম এবং কো-অপারেটিভ ইত্যাদির বিকাশের মাধ্যমে অভিযোজিত হতে পারে কিনা সে বিষয়ে। বার্নস্টেইন মনে করেছিলেন প্রলেতারিয়েত ধীরে ধীরে মধ্যবিত্ত হয়ে উঠতে পারে এবং তার থেকে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছিলেন যে বর্ধিত সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং কো-অপারেশনের নীতির ক্রমান্বয়িক প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব। এক্ষেত্রে লুক্সেমবার্গ প্রবলভাবে ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সুবিধাবাদী ধারাটিকে তাত্ত্বিকভাবে প্রতিষ্ঠা করার প্রথম পদক্ষেপ বলে একে অভিহিত করে তীব্র সমালোচনা করেছিলেন। তিনি বরং ইতিহাসের দ্বন্দ্বমূলক ও বস্তুবাদী ধারণার পক্ষে সওয়াল করেছিলেন।  

মুখ্যত যে বিষয়টা তাঁকে অনুপ্রেরিত করেছিল বলে আমার মনে হয় এবং দ্য অ্যাকিউমুলেশন অব ক্যাপিটাল বইয়ের ঠিক গোড়ায়ই তিনি সেটা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলছেন, আসল প্রশ্নটা হল (আমার মতে এখানেই পোলিটিক্যাল ইকোনমি বিষয়ক তাঁর কাজ এবং পুঁজিবাদী সমাজে নারীর ভূমিকা বিষয়ে তাঁর তাত্ত্বিক নির্মাণ এক জায়গায় এসে মেলে)। পুনরুৎপাদনের সমস্যা। সংকীর্ণ অর্থে নয় অর্থাৎ কেবল পুনরুৎপাদনমূলক কাজের ক্ষেত্রে নয় বরং পুঁজিবাদী ব্যবস্থারই পুনরুৎপাদনের প্রশ্ন। সমস্যাটা তিনি যেভাবে দেখিয়েছেন, “যখনই অর্থনৈতিক তত্ত্বের প্রবণতা হল পুনরুৎপাদনের সমস্যাটার আভাস পাওয়া মাত্রই, অর্থাৎ যখনই অন্তত এই সমস্যার আন্দাজ পেতে শুরু করে সঙ্গে সঙ্গেই হঠাৎ পুনরুৎপাদনের সমস্যাটিকে সংকটের সমস্যায় (Problem of crises) রূপান্তরিত করে ফেলা এবং এভাবেই সমস্যার সমাধান খুঁজে পাওয়ার রাস্তাটি নিজেই বন্ধ করে ফেলা। আমরা যখন পুঁজিবাদী পুনরুৎপাদনের কথা বলি, তখন বুঝতে হবে, উৎপাদনের গড় পরিমাণ হল এই প্রক্রিয়ার বিভিন্ন পর্যায়ের গড়। 

সুতরাং পুঁজিবাদের সংকট নয়, রোজা আলোচনা করেছিলেন পুঁজিবাদ যেভাবে টিঁকে থাকে সে বিষয়ে। সমস্যার সমাধান যেভাবে তিনি নির্দেশ করেছিলেন তা দু’বার ব্যাখ্যা করা হয়ে গেছে আমি আর পুনরাবৃত্তি করছি না। তবে দ্য অ্যাকিউমুলেশন অব ক্যাপিটালের উপসংহারে তিনি যা লিখেছিলেন সেটা এখানে তুলে দিচ্ছি, ‘পুঁজিবাদ এমন এক অর্থনৈতিক প্রক্রিয়া যার অস্ত্র হল প্রচার বা প্রোপাগান্ডা। এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা সমগ্র বিশ্বকে গ্রাস করতে চায় এবং অন্যান্য অর্থনীতিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলতে চায় কারণ কোনও শত্রুর অস্তিত্ব সে সহ্য করতে পারে না। আবার একইসঙ্গে এটা এমন এক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা নিজে নিজে টিঁকে থাকতে পারে না। অন্যান্য অর্থব্যবস্থাগুলিকে তার প্রয়োজন। এটি চরিত্রে আন্তর্জাতিক হতে চায়, কিন্তু পারে না, ভেঙে পড়ে কারণ আন্তর্জাতিক উৎপাদন হয়ে উঠতে এটি অক্ষম। 

রোজা লুক্সেমবার্গের চিন্তার এই অংশটা এবং এই তাত্ত্বিক নির্মাণ ক্যাপিটাল ও নন-ক্যাপিটালের মধ্যেকার সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচিত করেছে। পুঁজিবাদের বিকাশ ও বিস্তারের ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিকতা ও সাম্রাজ্যবাদ কতখানি পারস্পরিকভাবে অন্তর্নিহিত ছিল পরবর্তীকালে সেই বিষয়ক তর্কবিতর্কের জমিও প্রস্তুত করে দিয়েছে। এ বিষয়ে অধ্যাপক ইরফান হাবিব ও অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়কের ব্যাখ্যাও আপনারা শুনেছেন। অধ্যাপক প্রভাত পট্টনায়ক, কল্যাণ স্যান্যালের মত প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাও বিভিন্নভাবে ক্যাপিটাল ও নন-ক্যাপিটালের সম্পর্ক বিষয়ে আলোচনা করেছেন। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে কেন্দ্র করে এই সম্পর্কের বিভিন্ন দিক নিয়ে নানান তাত্ত্বিক বোঝপড়া তৈরি হয়েছে। কেবল ভারতের ক্ষেত্রে নয়, পৃথিবীব্যাপী ঔপনিবেশিকতা ও পুঁজিবাদের ক্ষেত্রে। আমার মতে ভারতে যেভাবে বিদ্যাচর্চার অগ্রসর ঘটেছে তাতে ওঁর কাজের এই অংশের প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে।  

দুর্ভাগ্যবশত দলীয় সংগঠন, নারীর প্রশ্নে এমনকি সামরিক ব্যবস্থা ও যুদ্ধ বিষয়ে রোজার লেখাপত্রগুলির ক্ষেত্রে এ কথা বলা যায় না। ভারতে এইসব ক্ষেত্রগুলিতে রোজা লুক্সেমবার্গের প্রভাব বা যোগাযোগ কমই লক্ষ করা যায়। 

নারী বিষয়ক তাঁর লেখাপত্রগুলো যদি দেখি – যদিও তিনি খুব কমই লিখেছেন এবং বেশিরভাগটাই ছেড়ে দিয়েছেন ক্লারা জেটকিনের উপরে, আমরা দেখব এর মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নারীর ভোটাধিকারের প্রশ্নটি নিয়ে তিনি কীভাবে ভেবেছেন। এই বিষয়েও অধ্যাপক হাবিব আলোচনা করেছেন। আমার মতে এটা লক্ষ করা দরকার যে, রোজা বিশ্বাস করতেন ভোটাধিকারের বিষয়টি কেবল নারীদের সমস্যা বা দায়িত্ব নয়, বরং এটা সাধারণভাবে প্রলেতারিয়েত নারী ও পুরুষ উভয়ের শ্রেণিস্বার্থগত সমস্যা।  

এ বিষয়ে তিনি আপস হীন অবস্থান নিয়েছিলেন। তার ফলে বেলজিয়ান সোশাল ডেমোক্র্যাটরা ১৯০২ সালে লিবারালদের সঙ্গে নির্বাচনী জোট করতে গিয়ে যখন সমঝোতার স্বার্থে নারীর ভোটাধিকারের দাবি ছেড়ে দিল তখন রোজা তাদের প্রকাশ্যে আক্রমণ করেছিলেন। নারীর ভোটাধিকারের প্রশ্নে রোজা আবশ্যিকভাবে প্রলেতারিয় নারীর রাজনৈতিক সমানাধিকারের প্রশ্নটিকে একটি তাত্ত্বিক কাঠামো দিয়েছিলেন কেবল অধিকার অর্জনের অধিকার হিসেবে দেখেননি। ১৯১২ সালে লেখা ‘উইমেন’স সাফরেজ অ্যান্ড ক্লাস স্ট্রাগল’ রচনায় তাঁর যুক্তিক্রমের কাঠামো দৃঢ়ভাবে প্রোথিত ছিল একটি অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক ভিত্তিতে। তিনি লিখেছেন,  

পিতৃতান্ত্রিক পরিবারবৃত্তের এক শীর্ণ, একাকী নারী শিল্প ও বাণিজ্যের চাহিদার প্রশ্নে যৎসামান্য, ততটাই যৎসামান্য রাজনীতির চাহিদার প্রশ্নেও। 

তিনি দেখিয়েছেন পুঁজিবাদী রাষ্ট্র এক্ষেত্রেও তার দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হয়েছে এবং সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট, তাদের ইউনিয়ন ও নারী সংগঠনগুলি (অধ্যাপক হাবিব যে সংগঠনগুলির কথা উল্লেখ করেছেন) এবং প্রোলেতারিয় শ্রেণিসংগ্রামের ফলেই আসলে মেয়েদের পৃথিবী আরও সুবিস্তৃত হয়েছে, তাদের মন ও চেতনার বিকাশ ঘটেছে। সমাজতন্ত্রই সমষ্টিগতভাবে প্রোলেতারিয় নারীর মানসিক পুনরুজ্জীবন ঘটিয়েছে, তাদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে একটি উদ্দেশ্যের দিকে চালিত করেছে। তাই নারী ভোটাধিকারকে রোজা সমাজতন্ত্রের উদ্দেশ্যে, বিপ্লব ও ক্ষমতায়নের লক্ষ্যপূরণের পথে একটা মাইলফলক হিসেবে দেখেছিলেন। কখনই তা শেষ লক্ষ্য ছিল না। 

চার্লস ফুরিয়ারের বক্তব্য ছিল যে কোনও সমাজে নারীর ক্ষমতায়নই সামগ্রিক ক্ষমতায়নের পরিমাপক। তাঁকে উদ্ধৃত করে রোজা এরপরে বলেছেন, ‘আমাদের বর্তমান সমাজের জন্য এ কথা সম্পূর্ণভাবে সত্যি। নারীর রাজনৈতিক অধিকারের দাবিতে এখন যে গণসংগ্রাম হচ্ছে তা প্রলেতারিয়েতের মুক্তির লড়াইয়ের একটা অংশ এবং তারই বহিঃপ্রকাশ। এখানেই নিহিত আছে এর শক্তি ও ভবিষ্যৎ… নারীর ভোটাধিকারের দাবিতে লড়াই করতে করতেই আমরা সেই মুহূর্তকে ত্বরান্বিত করব যখন বিপ্লবী প্রলেতারিয়েতের হাতুড়ির আঘাতে বর্তমান সমাজ ভেঙে পড়বে।’

মৃত্যুর এক শতাব্দী অতিবাহিত হওয়ার পরে আজ নারীর কাজ সম্পর্কিত রোজার থিসিসটি বিশেষ করে ভারতের সমকালীন নারী আন্দোলনের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রেখেছে। বর্তমান সময়ের বিভিন্ন সমস্যাবলীর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাঁর কথাগুলি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে, যেমন – ‘যতদিন পর্যন্ত পুঁজিবাদ ও এই মজুরি ব্যবস্থা চালু থাকবে ততদিন পর্যন্ত কেবল সেই কাজগুলিকেই উৎপাদনশীল কাজ হিসেবে বিবেচনা করা হবে যা উদবৃত্ত মূল্য উৎপাদন করে, যা পুঁজিবাদী মুনাফা তৈরি করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে যে নর্তকীর পায়ের ছন্দে তার মালিকের পকেটে মুনাফা সঞ্চিত হয় সে উৎপাদনশীল শ্রমিক, কিন্তু যে প্রলেতারিয় নারীরা ও মায়েরা বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী থেকে অক্লান্ত কঠোর পরিশ্রম করে যান তাঁদের পরিশ্রম ধার্য হবে অনুৎপাদনশীল শ্রম হিসেবে। শুনলে মনে হবে পাগলের প্রলাপ এবং একই সঙ্গে নির্মম কিন্তু এই পুঁজিবাদী অর্থনীতির পাগলামি আর নির্মমতার সঙ্গে এইটা ঠিক খাপ খেয়ে যায়। এই নির্মম বাস্তবকে পরিষ্কার আর স্বচ্ছভাবে দেখতে পাওয়াই প্রোলেতারিয়েত নারীর প্রাথমিক কাজ।’

এখন কেউ ওঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হন বা না হন,  নারী প্রশ্নে রোজা লুক্সেমবার্গ একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হিসেবেই থেকে যাবেন। যদিও নারী আন্দোলন বিষয়ে রোজা সামান্যই লেখালিখি করেছেন, কিন্তু ওঁর বক্তব্য ও তার সামগ্রিক গঠনে এমন অনেক উপাদানই রয়েছে যা আজও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। 

একেবারে শেষে যে বিষয়টি আমি বলব তা হল বুর্জোয়া লিবারালিজমের বিরুদ্ধে রোজার লড়াই। ১৯১২ সালে তিনি লেখেন ‘অন দ্য ফলেন উইমেন অব লিবারালিজম’। এখানে এক দিকে রোজা সমালোচনা করেছেন সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির নির্বাচনমূলক আপসকামী রণকৌশলের। অন্যদিকে তিনি দেখাতে চেয়েছেন সংসদীয় ব্যবস্থা এবং তার মিত্রদের পক্ষে শ্রেণিদ্বন্দ্বকে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব না এবং শেষমেশ সিস্টেমের পক্ষ অবলম্বন করে ফেলার বিপদের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করেছেন। যখন তিনি লিখেছিলেন যে পরবর্তী সামরিক বিল এ কথা প্রমাণ করে দেবে যে, আগের মতই প্রতিক্রিয়াশীলদের একমাত্র শত্রু এখনও সোশাল ডেমোক্রেসি, লিবারালরা নয়। তিনি সামরিকীকরণ ও সাম্রাজ্যবাদের প্রশ্নকে ‘আজকের রাজনীতির কেন্দ্রীয় অক্ষরেখা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন এবং সতর্ক করে দিয়ে বলেছিলেন যে যারা সামরিকীকরণের পক্ষে দাঁড়াচ্ছে তারা পরোক্ষ কর ও শুল্কের পক্ষেও দাঁড়াবে “কারণ ‘ক’-এর পরেই আসে ‘খ’”। সামরিকীকরণ ও ঔপনিবেশিকতার প্রশ্নে বুর্জোয়া দলগুলির অবিসম্বাদিত সংখ্যাগরিষ্ঠতা, কর ও শুল্কের প্রশ্নে (‘একটি পারিবারিক কলহ’) ভারসাম্য হারায়। ফলত একদিকে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটরা যুদ্ধ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে এইরকম আশা করা হয়েছিল আবার এর বিপরীতে ক্রমাগত আপস করে যাওয়া যার ফলশ্রুতিতে শেষ পর্যন্ত সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি ভেঙে গেল এবং গঠিত হল কমিউনিস্ট পার্টি।   

আজকের ভারতে কৃষকেরা রাস্তা জুড়ে মিছিল করছেন, শ্রমিক, ছাত্রছাত্রী এবং মহিলারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবার জন্য নতুন ফ্রন্ট গঠন করছেন। বার্লিনের স্কুলে বক্তৃতা দিতে গিয়ে রোজা তার ছাত্রছাত্রীদের বলেছিলেন, কেন তিনি পোলিটিক্যাল ইকোনমিকে এত বেশি করে গুরুত্ব দিয়েছিলেন। আজকের সময়ের প্রাসঙ্গিকতায় সে কথা একবার মনে করে নেওয়া উচিত। রোজা বলেছিলেন, ‘কেন পোলিটিক্যাল ইকোনমিকে আমরা বিজ্ঞানের মত করে পড়ব? যতদিন অব্দি মানুষের সঙ্গে মানুষের অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলি কোনও গোলমাল ছাড়াই নিয়ন্ত্রিত হত ততদিন অব্দি এই সম্পর্কগুলিকে কোনও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে বিচার করবার প্রয়োজন ছিল না। পুঁজিবাদী অর্থনীতির সূত্রপাত যখনই হয়েছে তখনই এ ব্যাপারটা বদলে গেছে। এই ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ‘সাইড এফেক্ট’ হল সংকট। আজকের সমাজে বেকারত্ব একটা স্থায়ী সমস্যা। তার পাশাপাশি রয়েছে প্রতিদিন ও প্রতি ঘন্টায় দাম বা মূল্যের ওঠানামা যে কারণে খুব অল্প সময়ে কোনও এক ব্যক্তি একটি আঙুলও না নড়িয়ে হয়ে যেতে পারেন কোটিপতি আবার একই সময়ে আরেকজন হয়ে পড়তে পারেন সর্বস্বান্ত ভিক্ষুক। এইসব ঘটনাবলী প্রাকৃতিকভাবে ঘটে না এবং অনিবার্যও নয়। এগুলি ঘটে মানুষের তৈরি করা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে, এগুলি মানুষেরই সৃষ্টি। তবে বুর্জোয়া সমাজ যখন এসবের মুখোমুখি হতে বাধ্য হয় তখন এমন ভাব করে যেন কতগুলি নিয়ন্ত্রণের অতীত, আধিদৈবিক শক্তি এসব ঘটাচ্ছে। আমরা একটি নৈরাজ্যবাদী অর্থনীতির সম্মুখীন হয়েছি যা আমাদেরকই অতিক্রম করে গিয়েছে। এই কারণেই অর্থনৈতিক জীবনের সম্পর্কগুলিকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পাঠ করবার এবং বিশ্লেষণ করবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে… পোলিটিক্যাল ইকোনমিই সমস্ত বিজ্ঞানের বিজ্ঞান। ভবিষ্যতের যে দেশ আমরা গড়ে তুলতে চাই তার মাটি এভাবেই প্রস্তুত হবে।’ 

যেদিন নির্মমভাবে তাঁকে হত্যা করা হয়েছিল তার ঠিক একদিন আগেই রোজা এই কথাগুলো লিখেছিলেন। তাঁর এই কথাগুলো দিয়েই আমার বক্তব্য শেষ করব – ‘বার্লিনে শৃঙ্খলা বিরাজমান। মূর্খ দালাল কোথাকার! তোমাদের ‘শৃঙ্খলা’ বালির দুর্গ। আগামী দিনেই বিপ্লব আবার ‘জেগে উঠবে, তার অস্ত্রের ঝনঝনানি শোনা যাবে,’ তার রণভেরী তোমাদের ভয়ে দিশেহারা করে দিয়ে উচ্চস্বরে ঘোষণা করবে : আমি ছিলাম, আমি আছি, আমি থাকব।’


উৎস: রোজা লুক্সেমবার্গ-এর শাহাদতের শততম বছরে রোজা লুক্সেমবার্গ ফাউন্ডেশন, সাউথ এশিয়া-র সহায়তায়, সেন্টার ফর উইমেন'স ডেভলপমেন্ট স্টাডিস ২০১৯ সালের মার্চ মাসে একটি প্যানেল ডিসকাশান-এর আয়োজন করে। এই প্যানেল ডিসকাশানে বক্তা হিসাবে উপস্থিত ছিলেন অধ্যাপক ইরফান হাবিব, অধ্যাপক উৎসা পট্টনায়ক ও অধ্যাপক চিরশ্রী দাশগুপ্ত। তাঁদের বক্তব্য এরপর সেন্টার ফর উইমেন'স ডেভলপমেন্ট স্টাডিস থেকে একটি বুকলেট আকারে ইংরেজিতে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়। আজকের নিবন্ধ অধ্যাপক চিরশ্রী দাশগুপ্তের বক্তব্যের লিখিত (অনূদিত) রূপ। 

ভাষান্তর: শিঞ্জিনী সরকার   


প্রথম পর্ব পড়ুন
দ্বিতীয় পর্ব পড়ুন

 


প্রকাশের তারিখ: ১৭-জানুয়ারি-২০২৪
শেয়ার:
সেভ পিডিএফ:


আপনার মতামত

এই লেখাটি আপনার কেমন লাগলো আপনার মতামত জানতে আমরা আগ্রহী।
আপনার মতামত টি, সম্পাদকীয় বিভাগের অনুমতিক্রমে, পূর্ণ রূপে অথবা সম্পাদিত আকারে, আপনার নাম সহ এখানে প্রকাশিত হতে পারে।



অন্যান্য মতামত:

রোজা নিয়ে তিনটি লেখাই চমৎকার
- Asif Iqbal, ১৭-জানুয়ারি-২০২৪


Donate Now
আপনি এখন ব্যাংক UPI / ফোনপে / গুগল পের মাধ্যমে মার্কসবাদী পথকে ডোনেশন দিতে পারেন।
You can now donate to Marxbadi Path through UPI of various apps or payment apps like PhonePay/GooglePay
ইতিহাস বিভাগে প্রকাশিত ১৪৮ টি নিবন্ধ
০৫-মে-২০২৬

০১-মে-২০২৬

২২-এপ্রিল-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

১০-মার্চ-২০২৬

২৮-ফেব্রুয়ারি-২০২৬

২৩-জানুয়ারি-২০২৬

১৭-জানুয়ারি-২০২৬

৩০-ডিসেম্বর-২০২৫

০৬-ডিসেম্বর-২০২৫